পিরিয়ডের বাইরে রক্তপাত মানেই কি ক্যানসার? ভুল ধারণা ভাঙলেন বিশিষ্ট অনকোলজিস্ট ডা. অদিতি ভাট

মাসিকের সময় ছাড়া শরীরের অন্য সময়ে রক্তপাত বা স্পটিং হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে ক্যানসারের কোনো যোগ থাকে না। হরমোনের পরিবর্তন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, থাইরয়েডের সমস্যা, ইনফেকশন, জরায়ুতে ফাইব্রয়েড বা পলিপের মতো সমস্যাগুলি এর জন্য মূলত দায়ী। তবে অস্বাভাবিক রক্তপাতকে বারবার অবহেলা করাও কিন্তু কোনো মারাত্মক গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যার রোগ নির্ণয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জিআই এবং গাইনোকোলজিক্যাল সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. অদিতি ভাট (Dr Aditi Bhatt) মহিলাদের কেন তাঁদের স্বাভাবিক রক্তপাতের ধরনে পরিবর্তনের প্রতি নজর দেওয়া উচিত এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

কেন অস্বাভাবিক রক্তপাতকে অবহেলা করা উচিত নয়?
বহু মহিলাই অনিয়মিত ঋতুচক্র, দুই পিরিয়ডের মাঝে স্পটিং কিংবা শারীরিক মিলনের পর রক্তপাতের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন, যেগুলিকে প্রায়শই ‘স্ট্রেস, হরমোনের গোলমাল বা মেয়েদের জীবনের অঙ্গ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে ডা. অদিতি জানান, “বহু প্রজন্ম ধরে মহিলাদের ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and watch) এই পরামর্শই দেওয়া হয়ে এসেছে। পিরিয়ড অনিয়মিত হলে বা স্পটিং দেখা দিলে তা স্রেফ মানসিক চাপ বা হরমোনের দোষ বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। অতীতে এই পরামর্শ হয়তো আংশিক সঠিক ছিল, কিন্তু বর্তমান যুগে তা আর যথেষ্ট নয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এসেছে—যেমন দেরিতে সন্তান ধারণ, স্থূলতা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের হার বেড়ে যাওয়া, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS), ক্রনিক স্ট্রেস, ঘুমের অনিয়ম এবং কম চলাফেরার জীবনধারা মহিলাদের হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে আগের তুলনায় সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।

জরায়ু, ডিম্বাশয় ও জরায়ুমুখের ক্যানসার বাড়ছে
গ্লোবোক্যান ২০২২ (GLOBOCAN 2022) ডেটার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান যে, ভারতের মতো দেশে প্রবীণ বা বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জরায়ু (Uterus), ডিম্বাশয় (Ovary) এবং সার্ভিক্স বা জরায়ুমুখের (Cervix) ক্যানসারের হার ক্রমশ বাড়ছে। ভারত প্রতি বছর ১.৪ লক্ষেরও বেশি নতুন গাইনোকোলজিক্যাল ক্যানসারের কেস রেকর্ড করে। অথচ এই মারণরোগগুলির বেশিরভাগেরই সূচনা হয় অত্যন্ত সাধারণ কিছু লক্ষণ দিয়ে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত।

কখন রক্তপাত নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিরিয়ডের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাতের কারণ ক্যানসার নয়। হরমোনের ওঠানামা, গর্ভনিরোধক বড়ি, আইইউডি (IUD), থাইরয়েড ডিসর্ডার, ইনফেকশন, ফাইব্রয়েড, পলিপ বা মেনোপজের আগের পর্যায় (Perimenopause) এর সাধারণ কারণ।

ডা. অদিতির মতে, সবথেকে বড় ভুল হলো সবসময় সবচেয়ে খারাপ বা ক্যানসারের আশঙ্কা করা, আবার একই সঙ্গে এটিকে ‘কিছুই নয়’ ভেবে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রক্তপাত হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত:

একটানা বা বেশ কয়েক মাস ধরে বারবার স্পটিং হওয়া।

মেনোপজের পরে রক্তপাত।

শারীরিক সম্পর্কের পর রক্তপাত।

অতিরিক্ত ভারী বা দীর্ঘস্থায়ী পিরিয়ড।

রক্তপাতের সঙ্গে তলপেটে ব্যথা, হঠাৎ ওজন হ্রাস বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে।

সচেতনতাই সুরক্ষার চাবিকাঠি
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আল্ট্রাসাউন্ড, এইচপিভি টেস্টিং (HPV testing), প্যাপ স্মিয়ার (Pap smear), হিস্ট্রোসকপি এবং মিনিমালি ইনভেসিভ বায়োপসির মাধ্যমে খুব সহজেই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, এর জন্য মানসিকতার বদল প্রয়োজন।

মহিলােরা সচরাচর নিজেদের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি পরিবারের অন্যান্য কাজ বা ব্যস্ততার পরে রাখেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে অনেক জটিল চিকিৎসাও সহজে সারিয়ে তোলা সম্ভব। রক্তপাত মানেই আতঙ্কিত হওয়া নয়, আবার তা প্রশ্নহীনভাবে স্বাভাবিক ধরে নেওয়াও বোকামি। তাই শরীরের এই ছোট ছোট সঙ্কেত সময়মতো বুঝতে পারলে ক্যানসারের মতো রোগকেও দূরে রাখা সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *