আমফানের ৩২ হাজার কোটির গরমিল! ‘টাকা মেরেছে শওকত-জাহাঙ্গীর’, বিস্ফোরক অভিযোগে তদন্তের দাবি সিপিএম নেতার

২০২০ সালের ২০ মে। বঙ্গোপসাগরের বুকে জন্ম নেওয়া বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকা। প্রলয়ঙ্কারী সেই ঝড়ে যেমন ধূলিস্যাৎ হয়েছিল হাজার হাজার মানুষের বসতবাড়ি, তেমনই অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক কাঠামোয় নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়। পরবর্তীতে সেই দুর্গতদের জন্য কেন্দ্রের পাঠানো ত্রাণ এবং পুনর্বাসনের অর্থ বণ্টন নিয়ে তৎকালীন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
সম্প্রতি বর্তমান রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আমফানের ক্যাগ (CAG) রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। সেই রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে—ত্রাণ ও নদী বাঁধ পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে। এই আবহে আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিলেন সিপিএমের প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়।
কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের সরাসরি চিঠি ও বিস্ফোরক অভিযোগ
আমফান ত্রাণের নামে বড়সড় আর্থিক দুর্নীতি এবং টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি বিজেপিশাসিত কেন্দ্রের কিংবা রাজ্যস্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহলের মৎস্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। শুধু অভিযোগ তুলেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি, গোটা ঘটনার নেপথ্যে থাকা দুর্নীতির মূলে পৌঁছাতে উচ্চপর্যায়ের উপযুক্ত তদন্তেরও জোরালো দাবি জানিয়েছেন এই প্রবীণ বাম নেতা।
অ-উপভোক্তাদের টাকা বিলির চাঞ্চল্যকর তথ্য
কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, সুন্দরবনের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করে এমন সব এলাকায় ক্ষতিপূরণের টাকা বিলি করা হয়েছে যার সঙ্গে নদী বা উপকূলের দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনও যোগাযোগ নেই। তাঁর সুনির্দিষ্ট দাবি:
বারুইপুর ও সোনারপুর: যে সমস্ত এলাকা নদী বা উপকূলবর্তী নয়, সেখানকার বাসিন্দাদেরও ত্রাণের টাকা দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে বারুইপুর ব্লকে মাত্র কয়েকটি ছোট খাল রয়েছে, সেখানকার ২৫০ জন ভুয়া উপভোক্তাকে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছিল।
ফলতা ও ক্যানিং: ফলতা এলাকায় ১০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীর নামে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই রকম অনিয়ম হয়েছে ক্যানিং পূর্ব অঞ্চলেও। যাদের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, রাজনৈতিক প্রভাবে তাদের অ্যাকাউন্টে ত্রাণের টাকা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরাসরি নামের উল্লেখ ও রাজনৈতিক তরজা
সাংবাদিক বৈঠকে ও চিঠিতে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, “আমফানে দুর্নীতি। মৎস্যজীবীদের নামে নৌকো কেনার জন্য ১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বারুইপুরে নৌকো নেই। ক্যানিং-২ এলাকায় নৌকা চলে বলে ৮০ লক্ষ টাকা শওকত ঝেরেছে। ফলতায় ১০ হাজার নৌকা চলে বলে জাহাঙ্গীর টাকা মেরেছে। এক্ষেত্রে গুণ্ডাদমন আইন প্রয়োগ করে দেখান।”
সিপিএম নেতার এই বিস্ফোরক মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বারুইপুর পূর্ব বিধানসভা এলাকার বিজেপি নেতা দিলীপ হালদার এই প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে বলেন, “আরও একটা দুর্নীতির অধ্যায় অবশ্যই উন্মোচিত হতে চলেছে।” সব মিলিয়ে, আমফানের ক্যাগ রিপোর্টের পর কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের এই নতুন পদক্ষেপ যে শাসক শিবিরকে আরও বেশি চাপে ফেলল, তা বলাই বাহুল্য।