ওজন বিভাগ বদলেই কামাল! গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে দেশের ঝুলিতে আরও এক ব্রোঞ্জ পদক

গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ (Commonwealth Games 2026)-এর মঞ্চে ফের ভারতের মুকুটে জুড়ল সাফল্যের নতুন ফলক। মহিলাদের ৫৮ কেজি বিভাগের ভারোত্তোলনে ব্রোঞ্জ পদক জিতে নিলেন তারকা ভারোত্তোলক বিন্দিয়ারানি দেবী (Bindyarani Devi)। এর আগে বার্মিংহাম গেমসে ৫৫ কেজি বিভাগে রুপো পেয়েছিলেন তিনি। এবার নিজের ওজন বিভাগ পরিবর্তন করলেও তাঁর সাফল্যের ধারা যে একটুও কমেনি, তা আবারও প্রমাণ করে দিলেন মণিপুরের এই কৃতি অ্যাথলেট। স্ন্যাচ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক মিলিয়ে মোট ১৯৯ কেজি ওজন তুলে গেমসে ভারতের পঞ্চম ভারোত্তোলন পদক নিশ্চিত করলেন তিনি।

রেকর্ড গড়ে নাইজেরিয়ার সোনা জয়
এবারের লড়াইটা বিন্দিয়ারানির জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। ৫৫ কেজি থেকে ওজন বাড়িয়ে সরাসরি ৫৮ কেজিতে নেমেছিলেন তিনি। এই বিভাগে তাঁর মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন নাইজেরিয়ার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রুপোজয়ী ভারোত্তোলক রাফিয়াতু ফোলসাদে লওয়াল (Rafiatu Folashade Lawal)। তিনি স্ন্যাচে ১০৩ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১২৬ কেজি (মোট ২২৯ কেজি) তুলে কমনওয়েলথে জোড়া রেকর্ড গড়ে অনায়াসেই সোনা জিতে নেন।

অন্যদিকে, কানাডার অ্যান-সোফি তাসচেরেউ মোট ২১৫ কেজি তুলে রুপো নিশ্চিত করেন। সোনা ও রুপোর লড়াইয়ের নাগাল পাওয়া না গেলেও, ব্রোঞ্জের পদক জয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত তীব্র লড়াই চালান বিন্দিয়ারানি।

নাটকিয় মোড় ও স্নায়ুর লড়াই
প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই পদকের লড়াইয়ে ছিলেন বিন্দিয়া। স্ন্যাচে একে একে ৮৩, ৮৫ এবং ৮৭ কেজি ওজন তোলেন তিনি। প্রথমার্ধে চতুর্থ স্থানে থাকলেও আসল নাটক অপেক্ষা করেছিল ক্লিন অ্যান্ড জার্ক বিভাগে। ব্রোঞ্জের জন্য ইংল্যান্ডের এলিজা প্র্যাটের সঙ্গে তাঁর হাড্ডাহাড্ডি টক্কর শুরু হয়।

প্রথম চেষ্টায় ১১০ কেজি ওজন তুললেও ফাউলের মুখে পড়েন বিন্দিয়ারানি। হাত বেঁকে যাওয়ার কারণে বিচারকরা সেই লিফট বাতিল করে দেন, যার ফলে হঠাৎ করেই তাঁর ওপর মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু দমে যাননি লড়াকু বিন্দিয়া। পরের চেষ্টাতেই দুর্দান্ত কামব্যাক করে ১১২ কেজি তোলেন তিনি। শেষ দুই বার ১১৬ কেজি তুলতে ব্যর্থ হলেও তাঁর আগের পয়েন্টের সুবাদে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হয়ে যায়। ব্রিটিশ প্রতিযোগী এলিজা মোট ১৯৬ কেজি তুলে চতুর্থ স্থানে শেষ করেন।

তাইকোন্ডো থেকে ভারোত্তোলনের আঙিনা
১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি মণিপুরের ইম্ফলে জন্ম বিন্দিয়ারানির। তাঁর ক্রীড়াজীবনের শুরুটা হয়েছিল তাইকোন্ডো দিয়ে। কিন্তু ২০১৩ সালে পথ বদল করে তিনি ভারোত্তোলনে (Women’s 58kg Weightlifting) মন দেন। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)-র ইম্ফল কেন্দ্রে কঠোর অনুশীলনের পর ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ঘুরে ২০১৯ সালে পাতিয়ালায় জাতীয় শিবিরে ডাক পান তিনি। ওই বছরই কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে আন্তর্জাতিক স্তরে নজর কাড়েন। এরপর ২০২১ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ক্লিন অ্যান্ড জার্কে সোনা এবং ২০২২ বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ৫৫ কেজি বিভাগে রুপো জেতেন।

চোট সারিয়ে অভাবনীয় কামব্যাক
২০২৩ সালটা ভীষণ কঠিন ছিল বিন্দিয়ারানির জন্য। হাঁটুর মারাত্মক চোটের কারণে দীর্ঘ সময় তাঁকে ম্যাটের বাইরে কাটাতে হয়। দুই হাঁটুতেই অস্ত্রোপচার ও রিহ্যাবের পর তিনি সাময়িকভাবে অলিম্পিক্সে বাদ পড়া ৫৫ কেজি বিভাগে ফেরেন এবং পরবর্তীতে পুরোপুরি ফিট হয়ে ৫৮ কেজিতে ওঠেন (Sports News)।

২০২৫ সালে দুর্দান্ত কামব্যাক করে জাতীয় গেমসে ৮৮ কেজি তুলে মীরাবাঈ চানুর স্ন্যাচ রেকর্ড ভেঙে দেন তিনি। এরপর আমদাবাদে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে মোট ২০৬ কেজি তুলে রুপো জিতে গ্লাসগোর টিকিট পাকা করেছিলেন। আর এবার গ্লাসগোয় ব্রোঞ্জ জিতে নিজের হার না মানসিকতা ও অদম্য জেদের ফের প্রমাণ দিলেন বিন্দিয়ারানি দেবী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *