একসময়ের গোলাবর্ষণের উপত্যকা আজ পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য! জম্মু-কাশ্মীরের সীমান্ত পর্যটনে রেকর্ড ভাঙল কোন এলাকা?

দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রবেশ এবং গোলাবর্ষণের জন্য কুখ্যাত জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) বরাবর সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো এখন সংঘাতের পরিবর্তে পর্যটনের নতুন মানচিত্র হয়ে উঠেছে। কেরান, গুরেজ, টাংধার, তিতওয়াল, উরি এবং তুলাইল উপত্যকার মতো সীমান্ত গ্রামগুলো বর্তমানে সারা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতির এতটাই উন্নতি হয়েছে যে, এই অঞ্চলের সব হোমস্টে পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে এবং কিষাণগঙ্গা নদীর তীরে পর্যটকদের তাঁবু টানার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না।

পর্যটকদের সংখ্যায় রেকর্ড বৃদ্ধি
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাত বছরে এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে ৫১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালে যেখানে মাত্র ৭,৯০০ জন পর্যটক এসেছিলেন, সেখানে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা ৪ লাখে পৌঁছে গেছে। অতীতে কোনো এক বছরে এটিই সর্বোচ্চ পর্যটক আগমনের রেকর্ড। এর আগে ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ ৪৩ হাজার পর্যটক এসেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ৭ লক্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

শান্তি ও যুদ্ধবিরতির প্রভাব
২০২১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে পর্যটনের গতি তীব্রতর হয়। সীমান্ত পারের গোলাবর্ষণ বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসে এবং প্রশাসন ধীরে ধীরে এই অঞ্চলগুলোকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলেই দিন দিন পর্যটকদের ভিড় বেড়েই চলেছে।

সীমান্ত পর্যটনের মূল আকর্ষণ
নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছাকাছি এসে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) সংলগ্ন গ্রামগুলো একনজর দেখার কৌতূহল থেকেই পর্যটকরা এখানে ছুটে আসছেন। কিষাণগঙ্গা ও ঝিলাম নদীর মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি করা এবং স্থানীয় কাশ্মীরি সংস্কৃতি, সুস্বাদু খাবার ও ঐতিহ্যবাহী চা উপভোগ করা এই ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ট্র্যাভেল এজেন্সি এই অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ সীমান্ত পর্যটন প্যাকেজ অফার করছে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে সুদিন
পর্যটকদের এই ঢল নামায় সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কাজের টানে যারা শহরমুখী হয়েছিলেন, সেই পরিবারগুলো নিজেদের গ্রামে ফিরে এসে পৈতৃক বাড়িগুলোকে আধুনিক হোমস্টে-তে রূপান্তর করছেন। পাশাপাশি, এলাকার যুবসমাজ ট্যুর গাইড, তাঁবু পরিচালনা এবং ট্যাক্সি চালনার মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে।

বদলে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনী
উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা, সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সীমান্ত গ্রামগুলোর জনপ্রিয়তাই নিয়ন্ত্রণ রেখাকে (LoC) কাশ্মীরের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। মাঝে ২০২৫ সালে পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার কারণে পর্যটনে কিছুটা ভাটা পড়লেও এবং সংখ্যা কমে ২.৩৪ লাক্ষে নেমে এলেও, বর্তমানে সেই ধাক্কা কাটিয়ে সীমান্ত পর্যটন ফের তার সর্বকালীন জোয়ার দেখছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *