বর্ষায় মশার কামড়েই মস্তিষ্কে মারাত্মক সংক্রমণ! ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার মাঝে কোন মারণ রোগের হানা?

বর্ষাকাল শুরু হলেই যেমন মশার উপদ্রব বাড়ে, তেমনই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না, মশার কামড়ের মাধ্যমে এমন একটি বিপজ্জনক ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে যা সরাসরি মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। এই ভয়ংকর রোগটির নাম জাপানিজ এনসেফালাইটিস (Japanese Encephalitis)। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই রোগ যেমন প্রাণঘাতী হতে পারে, তেমনই সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুর সমস্যা থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কীভাবে ছড়ায় এই রোগ?
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানিজ এনসেফালাইটিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত কিউলেক্স প্রজাতির সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। তবে সমস্ত মশার কামড়ে এই রোগ হয় না; শুধুমাত্র যে মশার শরীরে এই নির্দিষ্ট ভাইরাসটি রয়েছে, সেই মশা কামড়ালেই সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
সাধারণত শূকর এবং কিছু জলচর পাখি এই ভাইরাসের বাহক বা রিজার্ভার হিসেবে কাজ করে। সংক্রমিত প্রাণীকে মশা কামড়ানোর পর, সেই মশা যখন মানুষকে কামড়ায়, তখনই ভাইরাসটি মানুষের রক্তে প্রবেশ করে। সবথেকে বড় বিষয় হলো, এই রোগ একজন মানুষের থেকে সরাসরি আরেকজন মানুষের শরীরে ছড়ায় না।
মস্তিষ্কে কীভাবে আক্রমণ করে?
মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাসটি প্রথমে শরীরে প্রবেশ করার পর, বেশিরভাগ মানুষের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। ফলে অনেকের ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ দেখা যায় না বা খুব হালকা জ্বর হয়ে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি রক্তের মাধ্যমে সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় এবং সেখানে প্রদাহ বা ‘এনসেফালাইটিস’ তৈরি করে। এর ফলে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করতে পারে না এবং রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
ঝুঁকি কাদের বেশি এবং এর লক্ষণগুলি কী?
শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, ধানখেতের আশপাশ বা যেখানে শূকর পালন করা হয়, সেখানে এই ভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি থাকে।
প্রাথমিক লক্ষণ:
হঠাৎ জোরালো জ্বর ও তীব্র মাথাব্যথা
বমি বা বমি বমি ভাব এবং শরীর অত্যন্ত দুর্বল লাগা
ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
আলো সহ্য করতে না পারা
মারাত্মক লক্ষণ:
সংক্রমণ গুরুতর হলে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ বা মানসিক বিভ্রান্তি, কথা বলতে বা হাঁটতে সমস্যা হওয়া এবং বারবার ঘুম পেয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি জটিল হলে রোগী অচেতন হয়ে কোমায় পর্যন্ত চলে যেতে পারেন। এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।
চিকিৎসা ও বাঁচার উপায়
জাপানিজ এনসেফালাইটিসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী সাপোর্টিভ কেয়ার বা চিকিৎসা করা হয়। জ্বর নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি বন্ধ করা, শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা এবং প্রয়োজনে রোগীকে আইসিইউ (ICU)-তে রেখে চিকিৎসা করা হয়। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, জটিলতা কমার সম্ভাবনা ততই বাড়ে।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
বর্ষাকালে মশার কামড় এড়ানোই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায়।
বাড়ির আশপাশে বা টবে কোথাও জল জমতে দেবেন না।
রাতে অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমান এবং ফুলহাতা জামা ও লম্বা প্যান্ট পরুন।
ঘরের দরজা ও জানালায় মশার জালি লাগান এবং প্রয়োজনমতো মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন।
যে সমস্ত এলাকায় এই রোগের প্রকোপ বেশি, সেখানে সরকারি পরামর্শ মেনে জাপানিজ এনসেফালাইটিসের টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, বর্ষার দিনে সাধারণ জ্বর বলেও কোনো কিছুকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। জ্বরের সঙ্গে যদি তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই এই মারাত্মক রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।