সস্তা ফ্ল্যাটের যুগ শেষ! ৫০ লক্ষের নিচের বাড়ি কিনতে কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতারা?

মধ্যবিত্তের চিরাচরিত ধারণা পাল্টে যাচ্ছে হুহু করে। এখন আর কম দামের ছোট ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী নন ক্রেতারা। বরং তাঁদের প্রধান পছন্দ হয়ে উঠেছে বড় জায়গা, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং লাক্সারি লাইফস্টাইল। ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসের রিয়েল এস্টেট বাজারের তথ্য এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের ছবি তুলে ধরেছে।
৫০ লক্ষের কম দামের ফ্ল্যাটে ধস
আন্তর্জাতিক প্রপার্টি কনসালটেন্সি সংস্থা JLL-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের ৭টি প্রধান শহরে মোট আবাসন বিক্রি ৩ শতাংশ বেড়ে ১,৩৮,৩৮২ ইউনিটে পৌঁছেছে। একই সময়ে নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন বেড়েছে ৯ শতাংশ (১,৬৮,৫০৭ ইউনিট)।
তবে এই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে এক অন্য গল্প—
-
৩২% পতন: ৫০ লক্ষ টাকার কম দামের ফ্ল্যাট বিক্রি এক ধাক্কায় ৩২ শতাংশ কমে গেছে।
-
২০% পতন: ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাটের বিক্রিও কমেছে ২০ শতাংশ।
-
ফলে, ১ কোটি টাকার কম দামের বাড়ির বাজারের অংশীদারিত্ব আগের বছরের ৩৯ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে নেমে এসেছে মাত্র ২৮ শতাংশে।
কেন বাড়ছে প্রিমিয়াম ও বিলাসবহুল বাড়ির চাহিদা?
ক্রেতাদের আয়ের বৃদ্ধি এবং উন্নত জীবনযাত্রার আকর্ষণে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে দামি ফ্ল্যাটগুলি।
-
৫৮% উল্লম্ফন: ১.৫ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ির বিক্রি এক বছরে ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫১,২৩১ ইউনিটে পৌঁছেছে। এটি বর্তমানে দেশের রিয়েল এস্টেটের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বিভাগ।
-
৭১% দখল: ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ১ কোটি টাকার বেশি দামি বাড়িগুলি মোট বিক্রির এক বিশাল অংশ অর্থাৎ ৭১ শতাংশ দখল করেছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৬২ শতাংশ।
কোন শহরে কেমন হলো বিক্রি?
দেশের প্রধান সাতটি শহরের বাজারে ছবিটা একেক জায়গায় একেক রকম:
| শহর | বিক্রির গতিপ্রকৃতি | বিশেষত্ব |
| বেঙ্গালুরু | ১৬% বৃদ্ধি (৩৫,০১৭ ইউনিট) | বিক্রির দিক থেকে সেরা ফল এবং নতুন প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রেও শীর্ষে। |
| চেন্নাই | ২৭% বৃদ্ধি (৮,৫৮৭ ইউনিট) | এই শহরেই হয়েছে সর্বাধিক প্রবৃদ্ধি। |
| দিল্লি-এনসিআর | ৭% বৃদ্ধি (২০,৭৬১ ইউনিট) | স্থিতিশীল ও শক্তিশালী চাহিদা বজায় রয়েছে। |
| মুম্বই, পুনে, হায়দরাবাদ, কলকাতা | সামান্য হ্রাস (-১% থেকে -১৪%) | মুম্বই (-১%), কলকাতা (-১%), হায়দরাবাদ (-৩%) ও পুনেতে (-১৪%) বিক্রি সামান্য কমেছে। |
উল্লেখ্য, দেশের মোট আবাসন বিক্রির ৭৬ শতাংশই রেকর্ড হয়েছে মাত্র এই চারটি বাজারে—বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুনে এবং দিল্লি-এনসিআর।
হু হু করে বাড়ছে বাড়ির দাম ও নতুন প্রকল্প
ভবিষ্যতে আবাসন শিল্পের শক্তিশালী চাহিদার ওপর ভরসা রেখেই ডেভেলপাররা নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে আসছেন। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ১,৬৮,৫০৭টি নতুন ইউনিট বাজারে এসেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে একা বেঙ্গালুতেই ৪৮,৭৪৮টি নতুন ইউনিট চালু হয়েছে (৪১% বৃদ্ধি)।
দাম বাড়ল কত?
নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি এবং বিলাসবহুল বাড়ির লাগাতার চাহিদার জেরে সাতটি বড় শহরেই আবাসনের দাম ৬ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বেঙ্গালুরুতে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং চেন্নাই ও কলকাতায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
আগামী দিনের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিকাঠামো উন্নয়ন, দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জেরে আগামী দিনেও আবাসন বাজারে এই পজিটিভ ট্রেন্ড বজায় থাকবে। এপ্রিলে বিক্রির গতি কিছুটা ধীর হলেও, বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত—তা চাহিদা কমার লক্ষণ নয়, বরং নেহাতই মৌসুমি কারণ এবং ক্রেতাদের একটু সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল।