১ অক্টোবর থেকে ইউপিআই পেমেন্টে কি বাড়তি চার্জ দিতে হবে? জল্পনার মাঝেই বড় নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট!

ডিজিটাল লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম ইউপিআই (UPI) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু মার্চেন্ট পেমেন্টের ওপর অতিরিক্ত চার্জ আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় তাৎক্ষণিক কোনো স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। তবে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চ এই বিষয়ে কেন্দ্র সরকার, ইউপিআই স্টিয়ারিং কমিটি এবং ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI)-সহ সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে লিখিত জবাব তলব করে নোটিশ জারি করেছে। আসন্ন ১৫ অক্টোবর থেকে এই নতুন চার্জ কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় আদালতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুনানিতে আদালতের কড়া প্রশ্ন ও সরকারের সাফাই
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আইনজীবী অঞ্জন দত্তের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের শুনানি চলছিল। শুনানিপর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এন. ভেঙ্কটরামন আদালতকে জানান যে, এই নতুন চার্জগুলি আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর করা হবে। তবে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, এর ফলে প্রায় ৯৬ শতাংশ লেনদেনই সম্পূর্ণ চার্জমুক্ত থাকবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার ক্ষেত্রে চার্জের সর্বোচ্চ সীমা মাত্র ৫ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
এএসজি এন. ভেঙ্কটরামন স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, এই অর্থ কোনো ধরনের কর বা ফি নয়। ভারত সরকার এই ব্যবস্থা থেকে এক টাকাও সংগ্রহ করছে না। মূলত পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে লেনদেন নিষ্পত্তির (Settlement) জন্যই এই ব্যবস্থা। ইলেকট্রনিক লেনদেন প্রক্রিয়াকরণে ব্যাংকগুলির যে পরিচালনগত খরচ হয়, তা মেটাতেই এই ভাবনা।
যদিও এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট না হয়ে বিচারপতি বাগচী সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “এটি যদি কর বা ফি না হয়, তবে এই অর্থ সংগ্রহের প্রশাসনিক ভিত্তি কী? এর মাধ্যমে গ্রাহকদের কী ধরনের অতিরিক্ত পরিষেবা প্রদান করা হচ্ছে?”
আসলে পুরো বিষয়টি কী?
আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এনপিসিআই (NPCI) নির্দিষ্ট কিছু মার্চেন্ট পেমেন্টের ওপর একটি বিশেষ চার্জ বা এমডিআর (MDR) ধার্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ২,০০০ টাকার বেশি পেমেন্টের ক্ষেত্রে ০.৪ শতাংশ চার্জ কাটা হবে। এছাড়া ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি পেমেন্টের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা চার্জ ধার্য করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ বা গ্রাহকদের দৈনন্দিন ইউপিআই লেনদেনের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। সরকারের দাবি, এই পরিবর্তনের বেড়াজালে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ ছোট মার্চেন্ট লেনদেনই অক্ষত থাকবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ স্বস্তি
নতুন এই নীতিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যে সমস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইউপিআই কিউআর (UPI QR) কোডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করবেন, তাঁদের কোনো ধরনের চার্জ দিতে হবে না। পাশাপাশি রেল, টেলিকমিউনিকেশন, বীমা, জ্বালানি এবং কৃষি উপকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেনের জন্য মাত্র ৫ টাকার একটি নির্দিষ্ট চার্জ ধার্য করা হয়েছে।
আবেদনে ঠিক কী আপত্তি তোলা হয়েছিল?
সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর থাকা ‘জিরো-ফি’ বা নিখরচায় লেনদেনের ব্যবস্থাটি একপাক্ষিক ভাবে সংশোধন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জনমত যাচাই না করেই ২,০০০ টাকার বেশি ইউপিআই মার্চেন্ট পেমেন্টের ওপর এই চার্জ চাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পিটিশনে দাবি করা হয়।
সর্বোচ্চ আদালত আপাতত এই সিদ্ধান্তের ওপর কোনো অন্তর্বর্তীকালীন বা তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ জারি না করায়, নির্ধারিত সময় অর্থাৎ আগামী ১৫ অক্টোবর থেকেই এই নিয়ম চালুর পথ আপাতত খোলা রইল। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল লেনদেনের এই নতুন নীতি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।