“আপনারা কি কোনো সমঝোতা করেছেন?” সংসদে দাঁড়িয়ে স্পিকারকে লক্ষ্য করে অখিলেশ যাদবের বিস্ফোরক মন্তব্য!

দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার প্রতিবাদে এবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিল বিরোধী শিবির। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে তুমুল বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘটের পর, বুধবার বিরোধী সাংসদরা কালো পোশাক পরে এবং সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দিতে দিতে সরাসরি সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। তবে লোকসভায় এই জ্বলন্ত ইস্যু নিয়ে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ায় বেজায় ক্ষিপ্ত হন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। অধিবেশন চলাকালেই স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “আমাদের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না কেন? বিজেপি সুযোগ পেয়েছে, কংগ্রেসও সুযোগ পেয়েছে। তবে কি আপনাদের মধ্যে কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে?”
স্পিকারকে ঘিরে ধরে অখিলেশের তোপ
এদিন সংসদে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে অখিলেশ যাদব স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই নৃশংস ঘটনাটি নিছক কোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস বা সমাজবাদী পার্টির নয়, এটি এদেশের কোটি কোটি যুবসমাজ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা বিজেপিকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন, কংগ্রেসকেও দিয়েছেন। তবে কি আপনারা কোনো সমঝোতায় পৌঁছেছেন? কেন আমাদের মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে? এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কথা না শুনলে তারা ফের রাস্তায় নেমে আসবে। ইতিমধ্যেই পুলিশি নির্যাতনে শিক্ষার্থীদের হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে! আপনারা কি এবার মেয়েদের কাপড় ছিঁড়বেন? আমরা বাধ্য হয়েই সেদিন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়েছিলাম। যদি আপনারা আমাদের কথা ঠিকমতো শুনতেন, তবে আমাদের রাস্তায় নামতে হতো না।”
সংসদের অন্দরে কী নিয়ে বাঁধে বিপত্তি?
আজ দুপুর ১২টায় লোকসভার কার্যক্রম শুরু হতেই বিরোধী শিবিরের হট্টগোলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ চত্বর। অখিলেশ যাদবসহ সমাজবাদী পার্টির অন্য সাংসদরা উচ্চস্বরে কথা বলতে শুরু করেন এবং এই ইস্যুতে নিজেদের বক্তব্য রাখার জোর দাবি জানান। অখিলেশ যখন বক্তব্য রাখতে দারুণভাবে আগ্রহী, ঠিক সেই মুহূর্তেই স্পিকার কংগ্রেস সাংসদ কে.সি. ভেনুগোপালকে বক্তব্য রাখার জন্য আহ্বান জানান।
এরপর কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও নিজের বক্তব্য পেশ করতে শুরু করেন। ঠিক তখনই চরম অপমানিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করে অখিলেশ যাদব তাঁর কানে থাকা হেডফোন খুলে নিজের সহকর্মী সাংসদদের সঙ্গে আসন ছেড়ে ওয়াকআউট করতে উদ্যত হন। পুরো বিষয়টি খেয়াল করে স্পিকার তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেন এবং বলেন, “অখিলেশ জি, আপনিই তো আমাকে কথা বলার সুযোগ দিতে বলেছিলেন। আপনারও এই বিষয়ে বলা উচিত।” এর উত্তরে অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক সুরে অখিলেশ বলেন, “আমি আর কী বলব? আপনারা তো সরকার এবং কংগ্রেস—দুই পক্ষকেই একযোগে কথা বলার পুরো সুযোগ দিয়েছেন। বলুন, কোনো সমঝোতা হয়েছে কি?” জানা গেছে, অধিবেশন মুলতবি হওয়ার পরেও ভেনুগোপাল ও অখিলেশ যাদব এই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যান।
এদিকে, বিরোধী শিবির সূত্রে এও অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, অন্য শরিক দলগুলোকে না জানিয়ে বা অন্ধকারে রেখেই গত কাল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা হঠাৎ কেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে এককভাবে বিক্ষোভ করলেন? যদিও যন্তর মন্তরে সিজিপি-র ছাত্র বিক্ষোভে সমাজবাদী পার্টি প্রথম থেকেই লাগাতার সমর্থন দিয়ে গেলেও কংগ্রেস সচেতনভাবে যন্তর মন্তর থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখেছিল।
আলোচনায় প্রস্তুত সরকার, দাবি কিরেন রিজিজুর
অন্যদিকে, পুরো বিতর্ক প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সাফ জানিয়েছেন যে, সরকার প্রথম থেকেই নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমরা প্রথম দিন থেকেই সংসদে এ কথা বলে আসছি। ঠিক কখন, কত দিনের জন্য এবং কোন নিয়মের অধীনে এই আলোচনা সংঘটিত হবে, তা আমরা সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলেই স্থির করব।”
সকালে সাময়িক মুলতবির পর দুপুর ১২টায় লোকসভার অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে স্পিকার ওম বিরলা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার জন্য সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকে ডাকেন। ঠিক তখনই কংগ্রেস সাংসদ কে.সি. ভেনুগোপাল নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত সোমবার রাজধানীতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর সরকারের এই বর্বরোচিত লাঠিচার্জ ও তাণ্ডব দেখে পুরো জাতি স্তম্ভিত। আমাদের দাবি অত্যন্ত স্ফটিকস্বচ্ছ—শিক্ষামন্ত্রীকে সসম্মানে পদত্যাগ করতেই হবে। আপনারা যদি এতে রাজি হন, তবে অবিলম্বে আমাদের আনা মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ দিন।”
জবাবে মন্ত্রী কিরেন রিজিজু স্পষ্ট করে দেন যে, সরকার আলোচনায় পিছপা হচ্ছে না, তবে সবকিছুই নির্দিষ্ট সংসদীয় নিয়ম মেনে হতে হবে। লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা জানান যে, সমস্ত দলের মতামতই তিনি পেয়েছেন এবং উভয় পক্ষই এই বিষয়ে আলোচনা চায়। সরকারও যখন আলোচনার বিষয়ে নিজেদের সদিক্ষার কথা জানিয়ে দিয়েছে, তখন বিরোধী সদস্যরা লাগাতার হট্টগোল চালিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে স্পিকার দুপুর ২টা পর্যন্ত সভার কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণা করেন।