মোবাইলের নীল আলোয় তিল তিল করে নষ্ট হচ্ছে বাচ্চার মস্তিষ্ক! বিশ্ব ব্রেন ডে-তে চিকিৎসকদের ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সুস্থ শরীর এবং প্রখর মানসিক বিকাশই হলো শিশুর ভবিষ্যৎ সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং আধুনিক জীবনযাত্রার নানা খারাপ অভ্যাসের কারণে শিশুদের কচি মন ও মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আজ, ২২শে জুলাই, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস’ (World Brain Day)। সুস্থ মন ও মস্তিষ্ক বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়। দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য শিশুদের ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত জীবনের সমস্ত অগ্রগতিকে এক নিমিষে ব্যাহত করে দিতে পারে। বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস উপলক্ষে আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং তাদের ক্ষতি করছে এমন কিছু মারাত্মক দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে।
বাচ্চাদের মস্তিষ্ক সবসময় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়। শৈশবের এই সোনালী সময়ে তাদের নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং কোনো জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়। কিন্তু ছোট থেকেই কিছু খারাপ অভ্যাসের কারণে শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য, আইকিউ (IQ) এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা সরাসরি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
যে সমস্ত অভ্যাস শিশুর মস্তিষ্কের ওপর ফেলার নেতিবাচক প্রভাব:
মেট্রো গ্রুপ অফ হসপিটালসের সিনিয়র নিউরোলজিস্ট, স্ট্রোক স্পেশালিস্ট এবং যুগ্ম ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডঃ সোনিয়া লাল গুপ্তা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন, টেলিভিশন বা অন্যান্য গ্যাজেটের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার বদভ্যাসের ফলে শিশুদের মধ্যে গুরুতর অনিদ্রার সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ছোটদের মধ্যে অতিরিক্ত খিটখিটে ভাব, পড়াশোনায় মনোযোগের চরম অভাব এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জোরালোভাবে বলছেন যে, বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা আগের তুলনায় শারীরিকভাবে অনেক কম সক্রিয়। খেলাধুলা বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব তাদের সামগ্রিক মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকেও অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি, মাত্রাতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার ফলে শিশুদের দৈহিক শক্তি ও মানসিক মনোযোগ উভয়ই ভেঙে পড়ছে।
অভিভাবকদের যে বিষয়গুলো কঠোরভাবে মাথায় রাখা উচিত:
পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর সুষম খাদ্য: শিশুদের সর্বোত্তম মানসিক স্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশের জন্য গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত অপরিহার্য। ঘুমের সুনির্দিষ্ট সময়েই মস্তিষ্ক সারা দিনে শেখা সমস্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতাগুলো সুবিন্যস্ত করে নেয় এবং স্মৃতিশক্তিকে শক্তিশালী করে তোলে। একইসঙ্গে, মানসিক স্বাস্থ্য ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই। প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন, ভিটামিন এবং প্রয়োজনীয় খনিজ সমৃদ্ধ খাবার শিশুদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বহুগুণ উন্নত করতে সাহায্য করে।
শৈশবের অভ্যাস এবং স্নায়বিক বিকাশ: শৈশব ও কৈশোরের এই বিশেষ বয়সে মানুষের মস্তিষ্কে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (Neuroplasticity) নামক একটি অতি দ্রুত প্রক্রিয়া চলতে থাকে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কে নতুন নতুন স্নায়বিক সংযোগ বা নিউরাল পাথওয়ে তৈরি হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, একটানা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। যার ফলে শিশুদের জ্ঞানীয় কার্যকারিতা, মনোযোগ এবং শেখার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শারীরিক কসরত ও খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি: আজকের এই আধুনিক ডিজিটাল যুগে শিশুরা বাড়ির বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করার পরিবর্তে মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে। অথচ নিয়মমাফিক খেলাধুলা এবং শরীরচর্চা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা তাদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং নতুন কিছু দ্রুত আয়ত্ত করার দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই শুধু একঘেয়ে বইয়ের পড়ার মধ্যে আটকে না রেখে, শিশুদের ছবি আঁকা, গান গাওয়া, ধাঁধা মেলানো, গল্প পড়া এবং নানাবিধ সৃজনশীল কাজ শেখার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এই সমস্ত আনন্দদায়ক কার্যকলাপগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে একসাথে সক্রিয় করে একটি প্রখর ও সৃজনশীল মনের বিকাশ ঘটায়।
সর্বোপরি, শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার মানসিক চাপ বা প্রত্যাশার বোঝা তাদের কোমল মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি অভিভাবকের উচিত তাঁদের সন্তানদের সাথে নিয়মিত খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখা, তাদের নিজস্ব আগ্রহ ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ঘরের মধ্যে একটি ইতিবাচক ও চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।