রাজস্থানে লাফিয়ে বাড়ছে মাতৃমৃত্যু! প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে যোধপুরে প্রাণ হারালেন আরও দুই প্রসূতি

রাজস্থানে ক্রমবর্ধমান মাতৃমৃত্যুর পরিসংখ্যানের মাঝেই যোধপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই নারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে বড়োসড়ো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জানা গেছে, মৃতদের মধ্যে এক প্রসূতি গত ২৪ জুন স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জেরে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং দীর্ঘ ২৫ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে রবিবার গভীর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কীভাবে ঘটেছিল এই বিপর্যয়?
তিনওয়ারি এলাকার বাসিন্দা ওই প্রসূতির (সামু) প্রসবের পর থেকেই অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হয়। প্রথমে তাঁকে উমেইদ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হওয়ায় মহাত্মা গান্ধী হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। রক্তপাত বন্ধ করার জন্য চিকিৎসকরা তাঁর জরায়ু (Uterus) অপসারণ করতে বাধ্য হন। কিন্তু ততক্ষণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তাঁর কিডনিসহ শরীরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মহাত্মা গান্ধী হাসপাতালে তাঁকে ভেন্টিলেটর এবং ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালালেও শেষরক্ষা হয়নি।

প্রসবের পর মহিলাদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো কী?
মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ বি.এস. যোধা এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোকপাত করে জানান যে, মূলত কয়েকটি কারণে প্রসব-পরবর্তী সময়ে প্রসূতিদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে:

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage)

উচ্চ রক্তচাপ

রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া)

বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক সংক্রমণ

তিনি আরও জানান, এই ধরনের জটিল রোগীদের যদি সমস্যা শুরু হওয়ার প্রথম দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে কোনো বিশেষায়িত বা অ্যাডভান্সড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের জীবন বাঁচানো সম্ভব। চিকিৎসায় সামান্য বিলম্ব হলেই শরীরে অপরিবর্তনীয় শক (Irreversible Shock) হতে পারে, যা কিডনি, লিভার, ফুসফুস এবং হৃদপিণ্ডের মতো ভাইটাল অর্গানগুলোকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেয়।

বর্তমানে হাসপাতালের পরিস্থিতি ও নজরদারি
ডাক্তার যোধা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনার জেরে যোধপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে এবং অপর এক মহিলাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী হাসপাতালে দুজন এবং উমেইদ হাসপাতালে আরও দুজন গুরুতর অসুস্থ গর্ভবতী মহিলা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বর্তমানে উভয় হাসপাতালেই তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল তাঁদের নিয়মিত নজরে রেখেছেন।

প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ও বিশেষ পর্যালোচনা
রাজ্যে লাগাতার মাতৃমৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। হাসপাতালগুলোতে লেবার রুম (Labor Room) এবং অপারেশন থিয়েটারে (OT) স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা SOP কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে প্রতিদিন উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মাতৃমৃত্যুর ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক পরিণতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।

হবু মায়েদের জন্য চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ
গর্ভবতী মহিলাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশিকা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা:

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডাক্তার দেখান।

নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্তচাপ (BP) ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষা করান।

শরীরে সামান্যতম কোনো সমস্যা বা জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলেই দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *