গণপিটুনি থেকে সম্পত্তি দখল—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নতুন ধারা নিয়ে শোরগোল

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত দেড় বছরে (২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৬-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত) দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৩,১০০টিরও বেশি হিংসাত্মক আক্রমণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে।

নির্যাতনের বদলানো প্রকৃতি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্যাতনের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিক্ষিপ্ত হামলা হলেও, বর্তমানে ‘মব-সন্ত্রাস’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতিকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের ৮টি বিভাগের ৬২টি জেলায় শারীরিক নিগ্রহ, হত্যাকাণ্ড, মন্দির ও গির্জায় ভাঙচুর এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ‘মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস’। সমাজমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার সাজানো স্ক্রিনশট ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা, সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখতে শাঁখা বা সিঁদুরের মতো প্রথাগত প্রতীক ব্যবহারে ভয় পাচ্ছেন নারীরা, যা তাঁদের মৌলিক ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ ও প্রশাসনের ভূমিকা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) এবং ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’-এর মতো সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরেও সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ব্যর্থ হয়েছে।

  • বিচারহীনতা: গত কয়েক দশকে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নজিরবিহীন বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় লোপ পেয়েছে।

  • ভূমি দখল: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী মহল সংখ্যালঘু পরিবারের পৈতৃক জমি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দখল করছে, যার ফলে অনেক পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

  • আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ (USCIRF) এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশন (OHCHR) বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার এই দ্রুত অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সমাধানের পথে বাধা অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছে: ১. একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন। ২. ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হামলায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৩. ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদান।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের একাংশের পক্ষ থেকে এই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা অস্বীকার করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *