সোনার ঝাঁটায় পথ পরিষ্কার করেন রাজা, রথযাত্রায় লুকিয়ে থাকা তিন গভীর দর্শনের কথা জানেন?

পুরীর রথযাত্রার দিন বড়দাণ্ডায় লাখো ভক্তের ভিড়। কিন্তু সেই বিপুল জনসমুদ্রের মাঝেও সবার নজর আটকে থাকে এক অদ্ভুত দৃশ্যের দিকে। সোনার তৈরি একটি ঝাঁটা হাতে পুরীর গজপতি মহারাজ নিজে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথের সামনের রাস্তা পরিষ্কার করেন। শঙ্খ, উলুধ্বনি আর “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারিদিক। এই পবিত্র ও বিস্ময়কর রীতির নাম— ‘ছেরা পহরা’।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ঝাড়ু তো সাধারণ বাঁশের হতে পারে, তবে রাজা কেন সোনার ঝাঁটা ব্যবহার করেন? এর পেছনে লুকিয়ে আছে তিনটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ।
১. অহংকার ত্যাগ ও বিনয়:
পুরীর রাজা নিজেকে কখনো রাজা মনে করেন না, তিনি নিজেকে বলেন “জগন্নাথের দাসানুদাস”। রথযাত্রার দিন সোনার ঝাঁটা হাতে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, তাঁর রাজ্য, মুকুট বা ক্ষমতা—সবই প্রভুর সেবার কাছে তুচ্ছ। এটি মূলত রাজার ঐশ্বর্য ও সেবার মেলবন্ধন। সোনার ঝাঁটা হাতে রাজা গোটা বিশ্বকে বার্তা দেন যে, প্রভুর সেবার সামনে সমস্ত অহংকার ঝেড়ে ফেলাই প্রকৃত ধর্মের কাজ।
২. পবিত্রতার প্রতীক:
শাস্ত্রমতে, সোনা সবচেয়ে পবিত্র ধাতু। সময়ের সাথে রুপো বা তামা কালচে হয়ে গেলেও সোনা তার ঔজ্জ্বল্য হারায় না। ‘দারুব্রহ্ম’ বা জগন্নাথ দেবের রথের যাত্রা পথ হতে হয় সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত। যে পথ দিয়ে প্রভু যাবেন, সেই পথ যে ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করা হবে, তা হতে হবে সবচেয়ে পবিত্র। এই সোনার ঝাঁটার মাধ্যমে প্রতীকীভাবে বোঝানো হয় যে, প্রভুর পথে যেন কোনো হিংসা বা অশুচিতার ধুলো না থাকে।
৩. সাম্যের জয়গান:
‘ছেরা পহরা’ শুধুমাত্র রাস্তা পরিষ্কার করা নয়। রাস্তা ঝাড় দেওয়ার পর রাজা সেই সোনার ঝাঁটা জলে ডুবিয়ে সেই পবিত্র জল ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র, ধনী থেকে দরিদ্র—সব বর্ণের মানুষের গায়ে ছিটিয়ে দেন। এমনকি তিনি নিচু জাতের মানুষের পা ধুইয়ে দেন। এর মাধ্যমে রাজা ঘোষণা করেন যে, জগন্নাথের কাছে কোনো উঁচু-নিচু ভেদাভেদ নেই; সবাই সমান। ক্ষমতা মানে শাসন নয়, ক্ষমতা মানে সেবা—এই মূলমন্ত্রই রথের রশিতে হাত দেওয়ার আগে ভক্তদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়।
প্রতি বছর এই রীতির মাধ্যমে জগন্নাথ দেব আমাদের শিখিয়ে যান তিনটি অমোঘ সত্য: অহংকার ত্যাগ করো, মন পবিত্র রাখো এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান চোখে দেখো। রথের দড়িতে হাত দেওয়ার আগে এই পবিত্র দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম শুধু মন্ত্রপাঠ নয়, ধর্ম হলো বিনয় ও আর্তের সেবা।