‘স্তনে হাত দেওয়া ধর্ষণের চেষ্টা নয়’, হাইকোর্টের বিতর্কিত রায়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া ভর্ৎসনা

যৌন হেনস্থার মামলায় বিচারকদের রায়দানের ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবার কঠোর অবস্থানে সুপ্রিম কোর্ট। সম্প্রতি পটনা হাইকোর্টের একটি বিতর্কিত রায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ওই রায়ে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল যে, মহিলার সালোয়ার খোলা এবং স্তনে হাত দেওয়া ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ (Attempt to Rape)-এর পর্যায়ে পড়ে না।

সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ
মঙ্গলবার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি. মোহনের বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানায়, এই ধরনের রায় দেওয়ার আগে বিচারকদের আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আরও গভীরভাবে পড়াশোনা ও গবেষণা করা প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার অভাব রয়েছে। আদালতের কর্মীরাও এ বিষয়ে কোনো সহায়তা করছেন না।”

নতুন নির্দেশিকা ও হ্যান্ডবুক
যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থায় অভিন্নতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে সুপ্রিম কোর্ট বড় পদক্ষেপ নিয়েছে:

বিশেষ হ্যান্ডবুক: ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির তৈরি করা একটি হ্যান্ডবুক বা নির্দেশিকা বই অনুমোদন করেছে শীর্ষ আদালত।

শব্দ চয়ন: যৌন হেনস্থার মামলায় রায়দান বা এফআইআর (FIR) দয়ের করার সময় কী ধরণের ভাষা বা শব্দবন্ধ ব্যবহার করা যাবে, তা এই হ্যান্ডবুকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অনুসরণ: দেশের সমস্ত আদালত এবং প্রতিটি থানার পুলিশকে এই হ্যান্ডবুক কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। রাজ্য সরকারগুলিকে দ্রুত সব থানায় এই নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?
২০২৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায় এবং সম্প্রতি ৯ জুলাই পটনা হাইকোর্টের একটি রায়ের প্রেক্ষিতে এই বিতর্কের জন্ম হয়। পটনা হাইকোর্টের বিতর্কিত মামলাটি ছিল ২০০৮ সালের একটি ঘটনার, যেখানে স্টুডিওর ভেতরে এক তরুণীকে হেনস্থা করা হয়েছিল। নিম্ন আদালত একে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ হিসেবে গণ্য করলেও, হাইকোর্ট অভিযুক্তের সাজা কমিয়ে এটিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারায় ‘শ্লীলতাহানি’ বলে রায় দেয়। হাইকোর্টের যুক্তি ছিল, ধর্ষণের চেষ্টার জন্য যে পরিমাণ শারীরিক নিগ্রহ বা পেনিট্রেশনের প্রমাণ প্রয়োজন, তা এই ঘটনায় নেই।

কেন এই কড়াকড়ি?
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী শোভা গুপ্তা আদালতে জানান, যৌন হেনস্থার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বিচারকদের একাংশের এই ধরণের মন্তব্য বা রায় অপরাধীকে কার্যত উৎসাহিত করে এবং ভুক্তভোগীর মানসিক যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে। আদালতের দাবি, আইনি ব্যাখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো ঘটনার ভয়াবহতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *