মহাকাশে ভারতের জয়জয়কার! আজ রাতেই পাড়ি দিচ্ছেন মালয়ালি বংশোদ্ভূত প্রথম নাসা মহাকাশচারী!

বিশ্বমঞ্চে আবারও উজ্জ্বল হতে চলেছে ভারতের নাম। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) প্রথম মালয়ালি বংশোদ্ভূত নাসা (NASA) মহাকাশচারী হিসেবে এক ঐতিহাসিক সফরে রওনা হচ্ছেন ডক্টর অনিল মেনন (Dr. Anil Menon)। কাজাখস্তানের বৈকোনুর কসমোড্রোম থেকে রুশ নভোচারী পিওত্র দুব্রভ এবং আন্না কিকিনার সাথে আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ভারতীয় সময় ঠিক রাত ৮টা ১৭ মিনিটে মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছেন তিনি। উৎক্ষেপণের মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের মহাকাশযানটি ISS-এ নোঙর করবে।
নাসা এবং রসকসমস জানিয়েছে, এই মিশনটি আসলে ‘এক্সপেডিশন ৭৪’-এর অংশ। আগামী ৮ মাস মহাকাশ স্টেশনে থেকে চাঁদে ও মঙ্গলে মানুষের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদী মিশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন ৪৯ বছর বয়সী ডক্টর অনিল মেনন।
কে এই ডক্টর অনিল মেনন?
অনিল মেননের জন্ম আমেরিকার মিনেসোটার মিনিয়াপলিসে হলেও, তাঁর শিকড় রয়েছে ভারতের কেরালার পালাক্কাদ জেলার ওটাপালামে। তাঁর বাবা কে. পি. শংকরণ মেনন একজন ভারতীয় এবং মা এলিজাবেথ ইউক্রেন থেকে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। ভারতের প্রখ্যাত ব্রিটিশ আমলের আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামী স্যার চেতুর শংকরণ নায়ার ছিলেন অনিল মেননের প্রপিতামহ।
অনিল মেনন একাধারে একজন দক্ষ চিকিৎসক, এমার্জেন্সি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন মহাকাশ বাহিনীর (US Space Force) একজন কর্নেল। এর আগে তিনি ইউএস এয়ার ফোর্সের পাইলট হিসেবে আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’-এ অংশ নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, ‘হিমালয়ান রেসকিউ অ্যাসোসিয়েশন’-এর একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টে পর্বতারোহীদের জীবন বাঁচানোর কাজও করেছেন এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটি।
ডাক্তার থেকে নাসার মহাকাশচারী: এক রূপকথার যাত্রা
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে নিউরোবায়োলজিতে ডিগ্রি এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল ডিগ্রি অর্জন করেন অনিল। ২০১৪ সালে তিনি ফ্লাইট সার্জন হিসেবে নাসায় যোগ দেন, যেখানে মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীদের চিকিৎসার দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা হয় তাঁর।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি ইলন মাস্কের স্পেসএক্স (SpaceX)-এ যোগ দিয়ে কোম্পানির প্রথম মানব মহাকাশযান মিশনের মেডিকেল প্রোগ্রাম তৈরি করেন এবং ‘স্টারশিপ’ মহাকাশযান তৈরিতে সাহায্য করেন। অবশেষে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নাসা তাঁকে মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত করে। কঠোর প্রশিক্ষণ শেষ করে আজ তিনি তাঁর প্রথম দীর্ঘমেয়াদী মিশনে যাচ্ছেন।
মজার বিষয় হলো, মহাকাশ অভিযান যেন এই পরিবারের রক্তে রয়েছে! অনিলের স্ত্রী আন্না মেনন নিজেও একজন মহাকাশচারী। গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক ‘পোলারিস ডাউন’ (Polaris Dawn) প্রাইভেট মিশনে মহাকাশে ঘুরে এসেছিলেন আন্না।
মহাকাশে কী গবেষণা করবেন অনিল?
মহাকাশ স্টেশনে ৮ মাসের এই দীর্ঘ সফরে অনিল মেনন মানবদেহের ওপর ভরহীনতার (Microgravity) প্রভাব নিয়ে একাধিক পরীক্ষা করবেন। বিশেষ করে নভোচারীদের রক্তপ্রবাহ ও শিরার গঠনের পরিবর্তন এবং রক্তের উপাদানের রূপান্তর নিয়ে গবেষণা করবেন তিনি।
এ ছাড়া, ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ মিশনের জন্য মহাকাশ স্টেশনের পানযোগ্য জল ব্যবহার করে কীভাবে জরুরি স্যালাইন বা ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড তৈরি করা যায়, তার প্রযুক্তি পরীক্ষা করবেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটির (AR) সাহায্যে মহাকাশচারীরা যাতে পৃথিবীর চিকিৎসকদের সাহায্য ছাড়াই নিজেদের চিকিৎসা নিজেরা করতে পারেন, সেই প্রযুক্তিরও ট্রায়াল দেবেন ডক্টর অনিল। পাশাপাশি, মহাকাশে জিরো-গ্র্যাভিটিতে সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল তৈরির ওপর গবেষণা করবেন, যা ভবিষ্যতে এআই এবং উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে বিপ্লব আনতে পারে।