শিয়রে এল নিনো! প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাপে কি শুকিয়ে যাবে ভারতের বর্ষা? ঘুম কাড়ছে উদ্বেগজনক তথ্য

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে তৈরি হওয়া এক জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের জন্য বড় বিপদ সংকেত বয়ে আনছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ‘এল নিনো’-র প্রভাব নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় আবহাওয়াবিদ ও নীতি-নির্ধারকরা। গত বছরের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল (Nino 3.4) এই মুহূর্তে ১.৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ, যা ভারতের বর্ষার ওপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে।
কেন এই উদ্বেগ?
আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৪ জুলাই—প্রতিটি দিনেই প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি এল নিনোকে শক্তিশালী করছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জুন মাসে বড় ধাক্কা:
ভারতের বর্ষার ওপর প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩৯.৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯০১ সালের পর পঞ্চম শুষ্কতম জুন। কেরলে বর্ষার বিলম্বিত প্রবেশ থেকে শুরু করে উত্তর ও মধ্য ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি—পরিস্থিতি এখন বেশ উদ্বেগজনক।
কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা:
ভারতের বার্ষিক বৃষ্টির ৭০ শতাংশই আসে এই বর্ষার হাত ধরে। বর্তমান পরিস্থিতিতে:
খরিফ ফসল: ধান, ভুট্টা, তুলো ও সয়াবিনের বীজ বোনার সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি না হলে উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: উৎপাদন কমলে চাল, ডাল ও সবজির সরবরাহ কমতে পারে, যা বাজারে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ সৃষ্টি করবে।
জলাধার ও পানীয় জল: পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে দেশের বড় বড় জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পানীয় জল ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে।
সরকারের কনটিনজেন্সি প্ল্যান:
দুর্বল বর্ষার আশঙ্কায় কেন্দ্র আগেভাগেই সতর্ক। দেশের ৩০০-র বেশি জেলাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কনটিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। যে সব এলাকায় সেচব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজর রাখছে প্রশাসন।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা:
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো কেবল কম বৃষ্টির কারণ নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট করছে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও তীব্র খরা—এই দুই চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জুলাই ও অগাস্ট মাসের বৃষ্টিই এখন ভারতের কৃষি অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
সামগ্রিকভাবে, ভারত এখন এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই তাপমাত্রা যদি আরও বাড়তে থাকে, তবে ভারতের বর্ষার ওপর চাপ বাড়বে। তবে ভারতীয় আবহাওয়াবিদদের নজর রয়েছে ‘ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল’ (IOD)-এর ওপর। যদি এটি শক্তিশালী থাকে, তবে হয়তো এল নিনোর প্রভাব কিছুটা হলেও প্রশমিত হতে পারে। এখন নজর কেবল বৃষ্টির পরিমাণের ওপর নয়, বরং বৃষ্টি কোথায় এবং কখন হচ্ছে—তার ওপর।