৬ মাসের ডেডলাইন পার, তাও ভোট নেই! উত্তরপ্রদেশের ৩ আসনে উপনির্বাচন আটকে কেন? দানা বাঁধছে রহস্য

লোকসভা নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক মহলে পারদ চড়তে শুরু করেছে। যোগীরাজ্যের তিনটি বিধানসভা আসনের আসন্ন উপনির্বাচনকে ঘিরে ক্রমশ বাড়ছে উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি। মৌ-এর ঘোসি, সোনভদ্র-এর দুধি এবং বরেলি-র ফরিদপুর আসনগুলি নিজ নিজ বিধায়কের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে দীর্ঘ দিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। কিন্তু চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশন (ECI) এখনও পর্যন্ত এই আসনগুলিতে উপনির্বাচনের কোনও তারিখ বা তফসিল ঘোষণা করেনি। বিশেষ করে ঘোসির আসনটি নিয়ে রাজনৈতিক অলিন্দে সবচেয়ে বেশি জল্পনা তৈরি হয়েছে, কারণ এই আসনটি ইতিমধ্যেই টানা ছয় মাস ধরে বিধায়কহীন অবস্থায় রয়েছে।

সাধারণত, দেশের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী কোনও বিধানসভা আসন শূন্য হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে উপনির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের এই রহস্যময় নীরবতায় রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। খোদ নির্বাচন কমিশনও এই বিষয়ে এখনও কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

সচিবালয় থেকে দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে রিপোর্ট:
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, উত্তরপ্রদেশের যে তিনটি হাই-প্রোফাইল আসনে উপনির্বাচন বাকি রয়েছে, সেগুলি হল ঘোসি, দুধি এবং ফরিদপুর। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সমাজবাদী পার্টির (SP) বর্ষীয়ান বিধায়ক সুধাকর সিং-এর মৃত্যুর পর ঘোসি বিধানসভা আসনটি শূন্য হয়ে যায়। নিয়ম মেনে বিধানসভা সচিবালয় আসনটিকে শূন্য ঘোষণা করে এবং দ্রুত উপনির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সমস্ত তথ্য অবহিত করে।

এদিকে, বরেলির ফরিদপুর আসনের বিজেপি (BJP) বিধায়ক অধ্যাপক শ্যাম বিহারী লাল ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রয়াত হন। তার ঠিক পরের সপ্তাহেই, অর্থাৎ জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে পরলোকগমন করেন দুধি আসনের সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক বিজয় সিং। জানুয়ারি মাসেই এই দুটি আসনের শূন্যপদের সমস্ত নথি ও তথ্য নির্বাচন কমিশনের দিল্লির সদর দফতরে পাঠানো হয়েছিল।

সবার নজর এখন ঘোসির দিকে, কাটছে না আইনি বিভ্রান্তি:
বর্তমানে এই তিনটি আসনের মধ্যে ঘোসি বিধানসভা আসনটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি কাটাছেঁড়া চলছে। আগামী সপ্তাহেই এই আসনটি খালি থাকার মেয়াদ টানা ছয় মাস পূর্ণ করতে চলেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এতদিনে উপনির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কমিশনের এই দীর্ঘ বিলম্ব স্বাভাবিকভাবেই অনেক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভেতরের খবর, এই উপনির্বাচন পিছয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া। গত বছরের অক্টোবরের শেষে উত্তরপ্রদেশে শুরু হওয়া এই বিশেষ প্রক্রিয়াটির মেয়াদ দু-দুবার বাড়ানো হয়েছিল। তবে সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে গত ১০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে দেয়। তার পরও এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও উপনির্বাচন নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করা হয়নি।

কী বলছে ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন?
ভারতীয় সংবিধান ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৫০ এবং ১৫১ক ধারায় উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ১৫০ ধারা অনুযায়ী, বিধানসভার কোনও আসন খালি হলে নির্বাচন কমিশনকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে দ্রুত নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। আর ১৫১ক ধারা সাফ জানাচ্ছে, আসনটি শূন্য হওয়ার দিন থেকে ঠিক ছয় মাসের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজন করা বাধ্যতামূলক।

তবে এই আইনের কিছু ব্যতিক্রমী দিকও রয়েছে। যদি বর্তমান বিধানসভার অবশিষ্ট মেয়াদ এক বছরের কম থাকে, অথবা নির্বাচন কমিশন যদি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য কোনও অনিবার্য কারণে এই মুহূর্তে নির্বাচন করা সম্ভব নয়, তবেই একমাত্র উপনির্বাচন স্থগিত রাখা যেতে পারে।

উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার মেয়াদ ও নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা:
উল্লেখ্য, বর্তমান উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০২২ সালের ২৩ মে। সেই অনুযায়ী, এই বিধানসভার মেয়াদ আগামী বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সালের ২২ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে। অর্থাৎ, যোগী সরকারের মেয়াদ শেষ হতে এখনও প্রায় এক বছর বাকি রয়েছে। ফলস্বরূপ, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এই তিনটি শূন্য আসন পূরণের জন্য উপনির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। যেখানে ফরিদপুর ও দুধি আসন দুটি প্রায় চার মাস ধরে শূন্য রয়েছে, সেখানে ঘোসি আসনে ইতিমধ্যেই ছয় মাসের সময়সীমা পার হয়ে গেছে।

এই বিষয়ে প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজেন্দ্র কুমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, “কমিশনের উচিত অবিলম্বে জনসমক্ষে এসে ব্যাখ্যা দেওয়া যে কেন এই উপনির্বাচন আটকে রাখা হয়েছে। অন্যথায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে। যেহেতু বিধানসভার মেয়াদ এক বছরের বেশি বাকি আছে, তাই নিয়ম মেনে দ্রুত ভোট করানো উচিত।”

যদিও এই বিষয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা (CEO) নবদীপ রিনওয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর দফতর থেকে কোনও সদুত্তর মেলেনি। এখন দেখার, নির্বাচন কমিশন কবে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের উপনির্বাচনের ঢাক বাজায়। গোটা উত্তরপ্রদেশের নজর এখন দিল্লির নির্বাচন সদনের দিকে।