IPO-র নামে ভারত থেকে গায়েব বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার! হুন্ডাই-এলজি-র এই গোপন চাল জানলে চমকে উঠবেন!

বিগত কয়েক বছরে ভারতীয় শেয়ার বাজার বিশ্বের বুকে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উপচে পড়া ভিড়ে আইপিও (IPO) বাজারে রীতিমতো রেকর্ড জোয়ার এসেছে। কিন্তু এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক উদ্বেগজনক সত্য। ভারতের এই রমরমা বাজারকে বিদেশি সংস্থাগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নয়, বরং মোটা অঙ্কের মুনাফা লুটে সেই টাকা নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ওএফএস (OFS) মডেলের ফাঁদ: কোম্পানি পাচ্ছে না কোনো নতুন তহবিল
বাজার গবেষণা সংস্থা ‘প্রাইম ডাটাবেস’-এর সাম্প্রতিক তথ্য দেশের অর্থনীতিবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের পর ভারতে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রধান ৬টি বিদেশি কোম্পানির মধ্যে মাত্র একটি কোম্পানি নতুন তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বাজারে এসেছিল। বাকি সবকটি সংস্থাই হেঁটেছে ‘অফার ফর সেল’ বা ওএফএস (OFS) এর পথে। ওএফএস মডেলের সহজ অর্থ হলো—এখানে নতুন কোনো পুঁজি তৈরি হয় না, বরং কোম্পানির বর্তমান বিদেশি মালিকরা ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের শেয়ার চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে পুরো টাকা পকেটে পুরে দেশ ছাড়েন।

টাকা তোলার দৌড়ে শীর্ষে হুন্ডাই ও এলজি! ১ ডলারের বদলে বাইরে যাচ্ছে ৫৯ ডলার
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি মূল সংস্থাগুলো তাদের ভারতীয় ইউনিটের আইপিও-র মাধ্যমে বাজার থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি) তুলে নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিপুল অর্থের ৮০ শতাংশেরও বেশি পকেটে পুরেছে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই জায়ান্ট ‘হুন্ডাই মোটর’ এবং ‘এলজি ইলেকট্রনিক্স’। হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, ভারতে এই আইপিওগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে ৫৯ ডলারেরও বেশি অর্থ সরাসরি চলে গেছে বিদেশি সংস্থাগুলোর সদর দপ্তরে। এই একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়ালমার্টের মালিকানাধীন ‘ফোনপে’, সুইডেনের গেমিং ইউনিট, ‘কোকা-কোলা’ এবং ‘কার্লসবার্গ’-এর মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলোও।

মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশনের আকাশ-পাতাল ফারাক
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় বাজারে শেয়ারের যে আকাশছোঁয়া মূল্যায়ন (High Valuation) মিলছে, সেটাই বিদেশি সংস্থাগুলোর লোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সুইজারল্যান্ডের মূল ‘নেসলে’ কোম্পানির প্রাইস-আর্নিংস (P/E) অনুপাত যেখানে মাত্র ২২ গুণ, সেখানে ‘নেসলে ইন্ডিয়া’-র মূল্যায়ন প্রায় ৭৭ গুণ! একইভাবে এলজি ইলেকট্রনিক্স ইন্ডিয়ার ভ্যালুয়েশন তাদের দক্ষিণ কোরিয়ার মূল কোম্পানির চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে ভারতে শেয়ার বিক্রি করা মাত্রই রাতারাতি বিপুল মুনাফা পেয়ে যাচ্ছে এই বিদেশি কোম্পানিগুলো।

ভারতীয় রুপির ওপর বাড়ছে তীব্র চাপ, ধস নামার আশঙ্কা
এইভাবে আইপিও-র আড়ালে দেশ থেকে ডলারের বহির্গমন সরাসরি আঘাত হানছে ভারতীয় রুপির (INR) ওপর। ২০২৪ সাল থেকে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য প্রায় ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার মধ্যে চলতি বছরেই কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। অ্যাক্সিস ব্যাংকের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ তনয় দালাল এই বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছেন, আইপিও সংক্রান্ত এই মূলধন বহির্গমন এবং সেই সঙ্গে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (FPI) লাগাতার শেয়ার বিক্রির হিড়িক রুপির ওপর চাপকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে।

আমেরিকাকে টেক্কা দেওয়ার মুখে ভারত, কিন্তু আসল লাভ কার?
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারতই ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আইপিও বাজার। গত বছর ৩৬৭টি কোম্পানি আইপিও-র মাধ্যমে প্রায় ২১.৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। বর্তমানেও প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আইপিও সেবি (SEBI)-র অনুমোদনের অপেক্ষায় পাইপলাইনে রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল অর্থের সিংহভাগই যদি দেশের মূলধন গঠনে বা নতুন কর্মসংস্থানে কাজে না লেগে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়, তবে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ কী? আইপিও যদি কর্পোরেট সম্প্রসারণের পথ ছেড়ে বিদেশি পুঁজি মালিকদের ‘টাকা নিয়ে পালানোর রাস্তা’ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড়সড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।