একই গাছে ল্যাংড়া-আলফনসো! জাদুর কাঠি নয়, এক গাছের ডালে হরেকরকম আমের চাবিকাঠি লুকিয়ে এই কৌশলে!

আপনি কি কখনো এমন কোনো গাছের কথা শুনেছেন, যেটির একটি ডালে ঝুলছে ল্যাংড়া আর অন্য ডালে আলফনসো? শুনতে কোনো রূপকথা বা জাদু মনে হলেও, এটি আসলে আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের এক চমৎকার বাস্তব। বর্তমান সময়ে কম জায়গায় বেশি ফলন পেতে এবং শৌখিন বাগানপ্রেমীদের শখ পূরণ করতে এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আম চাষে এই কৌশলের ব্যবহার এখন ঘরে ঘরে। এই জাদুকরী পদ্ধতির নাম হলো ‘গ্রাফটিং’ বা কলম করা।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব ঠিক কীভাবে একটি মাত্র গাছে বিভিন্ন জাতের আমের ফলন সম্ভব এবং এর সহজ কৌশলগুলো কী কী।
কলম বা গ্রাফটিং আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কলম হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেখানে দুটি ভিন্ন গাছের অংশকে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা পরবর্তী সময়ে একটি একক গাছ হিসেবে বেড়ে ওঠে। এই পদ্ধতিতে যে গাছের গোড়া বা মূল অংশটি মাটির সাথে যুক্ত থাকে, তাকে বলা হয় ‘রুটস্টক’। আর অন্য যে গাছের ডালটি এনে এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় ‘সায়ন’। যখন এই দুটি অংশ নিখুঁতভাবে জোড়া লেগে যায়, তখন মূল গাছটির পুষ্টি ব্যবহার করেই অন্য জাতের ডালটি বড় হতে থাকে এবং সেই জাতের ফল দিতে শুরু করে। এই কৌশলেই একই গাছে দশেরি, ল্যাংড়া বা আলফনসো একসাথে ফলানো সম্ভব।
আম গাছে কলম করার সহজ পদ্ধতি
আপনার বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে যদি জায়গা সীমিত থাকে, অথচ আপনি একাধিক জাতের সুস্বাদু আম পেতে চান, তবে কলম করাই সবচেয়ে সেরা উপায়। এর জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
সঠিক গাছ নির্বাচন: প্রথমে একটি সুস্থ, সবল এবং রোগমুক্ত মূল গাছ (রুটস্টক) বেছে নিন।
ডাল সংগ্রহ: এবার আপনি যে জাতের আম ফলাতে চান, সেই গাছ থেকে একটি তাজা ও স্বাস্থ্যকর ডাল (সায়ন) কেটে নিন।
জোড়া লাগানো: মূল গাছের একটি ডালে সামান্য চিরে বা কেটে নিন। এবার সংগৃহীত অন্য জাতের ডালটির মাথাটি ত্যারছা করে কেটে মূল গাছের কাটা অংশে নিখুঁতভাবে বসিয়ে দিন।
সুরক্ষা: জোড়া লাগানো অংশটি যাতে নড়ে না যায় এবং বাতাস বা জল না ঢোকে, সেজন্য গ্রাফটিং টেপ বা প্লাস্টিক দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিন।
কয়েক সপ্তাহ পর যখন ওই জোড়া লাগানো অংশ থেকে নতুন কচি পাতা গজাতে শুরু করবে, তখনই বুঝবেন আপনার কলম পদ্ধতি সফল হয়েছে।
কলম করার পর গাছের বিশেষ পরিচর্যা
কলম করার পর গাছটির বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। কারণ প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠতে গাছের কিছুটা সময় লাগে।
আলো ও জল: নতুন কলম করা গাছটিকে শুরুতেই কড়া রোদে রাখবেন না, হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন। টবের বা গাছের গোড়ার মাটি যেন সবসময় ভেজা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। অতিরিক্ত জল দিলে শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ছাঁটাই: গাছের শক্তি যাতে কেবল নতুন ডালটির বৃদ্ধিতেই কাজে লাগে, সেজন্য মূল গাছের অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় বা শুকনো ডালপালা থাকলে তা নিয়মিত ছেঁটে ফেলুন।
সার প্রয়োগ: গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ভালো ফলনের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর জৈব সার ব্যবহার করুন।
সঠিক নিয়মে পরিচর্যা করলে অল্প দিনের মধ্যেই আপনার সাধের গাছটি হরেকরকম আমে ভরে উঠবে। ছাদবাগান বা বাড়ির ছোট বাগানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে এই বর্ষায় আপনিও চেষ্টা করে দেখতে পারেন এই আধুনিক পদ্ধতি।