ভালোবাসার চরম পরিণতি! চার হাত এক হতেই এল খুনের হুমকি, বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল সব?

“মা-বাবা, আমরা ভুল পথে এগোচ্ছি। তোমরা আমাদের বিয়ে দাওনি, তাই আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। মেয়েটির পরিবার বলেছে বিয়ে করলে আমাদের মেরে ফেলবে। তাই আমরা আত্মহত্যা করছি। আমার করা সব ভুলের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও। দুঃখিত…”

মারা যাওয়ার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে কান্নাভেজা গলায় এই শেষ ভিডিও বার্তাটি রেকর্ড করে নিজেদের মায়ের ফোনে পাঠিয়েছিল এক সদ্যবিবাহিত যুগল। আর তার কিছুক্ষণ পরেই বিষপান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তাঁরা। অনার কিলিং বা পরিবারের হাতে খুনের আতঙ্কে বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে গেল এই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি। বিষপানের জেরে ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে ২০ বছর বয়সী বরের, আর কনে হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াই। বিহারের ভাগলপুরের কাহালগাঁও থানার শিবকুমারী পাহাড় মহল্লায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে।

দেড় বছরের প্রেম, চার হাত এক হতেই খুনের হুমকি!
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত যুবকের নাম লক্ষ্মীকান্ত কুমার (২০), তিনি আদলপুরের বাসিন্দা সুভাষ কুমার সিং-এর ছেলে। অন্যদিকে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা তরুণী হলেন বাঁকা জেলার বাসিন্দা কুলদীপ মণ্ডলের মেয়ে অমৃতা কুমারী (১৮)। অমৃতা আদলপুরে তাঁর দাদুর বাড়িতে থাকার সময়ই লক্ষ্মীকান্তের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গত প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

গত শুক্রবার দুজনেই নিজেদের জীবন একসাথে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। লক্ষ্মীকান্ত অমৃতাকে নিজের বাড়িতে ডেকে এনে সামাজিক নিয়ম মেনে বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ের খবর অমৃতার পরিবারের কাছে পৌঁছাতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অভিযোগ, তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে নবদম্পতিকে কেটে ফেলার বা প্রাণে মেরে ফেলার তীব্র হুমকি দেওয়া শুরু হয়।

ভিডিও বার্তা পাঠিয়েই বিষপান
পরিবারের এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ও প্রাণভয়ে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ওই তরুণ-তরুণী। লোকচক্ষুর আড়ালে কাহালগাঁওয়ের শিবকুমারী পাহাড়ের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখান থেকেই পরিবারের উদ্দেশ্যে ওই আবেগঘন শেষ ভিডিও বার্তাটি রেকর্ড করে পাঠান লক্ষ্মীকান্ত। এরপর শুক্রবার বিকেল ৪টে নাগাদ দুজনেই একসাথে বিষপান করেন।

ঘটনার পরই দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা লক্ষ্মীকান্তকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে অমৃতার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে মায়াগঞ্জ হাসপাতালের আইসিইউ (ICU)-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই অমৃতা জানান, “আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মা আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ায় আমরা ভয় পেয়ে বিষ খাই।”

“ওরা ফিরে এলে তো মেনেই নিতাম!” কান্নায় ভেঙে পড়ল পরিবার
ছেলের এই আকস্মিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না লক্ষ্মীকান্তের পরিবার। পেশায় কাপড়ের ব্যবসায়ী, মৃতের বাবা সুভাষ সিং ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, “মাস চারেক আগে ওদের সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে ওরা এমন একটা চরম পথ বেছে নেবে। ওরা যদি বিয়ে করে বাড়ি ফিরে আসত, আমরা তো ওদের দুজনকেই সানন্দে মেনে নিতাম! কেন ওরা আমাদের কিচ্ছু জানাল না?” ছেলের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর মা সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ ও মুহ্যমান।

ঘটনার তদন্তে নেমেছে আমদান্ডা এবং কাহালগাঁও থানার পুলিশ। আমদান্ডা থানার প্রধান বিশাল কুমার জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং উভয় পক্ষের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মৃতের পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর এই অনার কিলিং-এর হুমকির বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওদিকে পুরো এলাকা জুড়ে এখন কেবলই শোকের ছায়া।