ফ্লাইটের বদলে ট্রেন, বন্ধ হচ্ছে অকারণ ট্যুর! ইনফোসিস থেকে টাটা— কর্মীদের জন্য কেন হঠাৎ কড়া নিয়ম কর্পোরেট দুনিয়ায়?

বিশ্বজুড়ে চলা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেই বড়সড় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে ভারতের প্রথম সারির কর্পোরেট সংস্থাগুলো। তবে এবারের লক্ষ্য কোনো ছাঁটাই নয়, বরং ‘আর্থিক বিচক্ষণতা’ এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার। খরচ বাঁচাতে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামোকে আরও মজবুত করতে দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, হাইব্রিড মডেলের বিস্তার এবং শক্তি সাশ্রয়ের ওপর নজিরবিহীন জোর দিচ্ছে।

উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে দেশবাসীকে সংযম অবলম্বন এবং দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ ভোগের যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছিলেন, কোম্পানিগুলোর এই নয়া কৌশল ঠিক তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

বাড়ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’, প্রযুক্তিতেই ভরসা
কর্মীদের অফিসে ডেকে আনার চেনা ট্রেন্ড থেকে উল্টো পথে হেঁটে কোম্পানিগুলো এখন আবার দূরবর্তী কাজ বা রিমোট ওয়ার্কিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। দেশের অন্যতম প্রথম সারির বেসরকারি ব্যাংক ‘ইন্ডাসইন্ড ব্যাংক’ তাদের রোস্টার-ভিত্তিক ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম নীতি একাধিক বিভাগে প্রসারিত করছে। ব্যাংকের চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার অমিতাভ কুমার সিং জানান, একটি সফল পাইলট প্রজেক্টের পর তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং পরিচালনগত কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করছে।

একইভাবে ‘হোমলেন’-এর মতো সংস্থাও কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ করছে। অন্যদিকে ক্যাপজেমিনি, ইনফোসিস, আরপিজি এবং এইচইউএল-এর মতো আইটি ও এফএমসিজি জায়ান্টরা নবায়নযোগ্য শক্তি, ভার্চুয়াল সহযোগিতা এবং আইওটি (IoT) ভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খরচ কমানোর পথ বেছে নিয়েছে।

কড়া নজরে বিমান ভ্রমণ: ফ্লাইটের বদলে ট্রেনের দাওয়াই!
বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক ভ্রমণ এখন কর্পোরেট জগতে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘লুপিন’-এর গ্লোবাল এইচআর প্রেসিডেন্ট যশবন্ত মহাদিক জানিয়েছেন, তাঁর কোম্পানি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ অত্যন্ত কঠোর করেছে। শুধুমাত্র অত্যন্ত জরুরি ব্যবসায়িক কাজ ছাড়া কাউকেই ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

একই পথ অনুসরণ করেছে আরপিজি গ্রুপ এবং পিডব্লিউসি ইন্ডিয়া। তারা কর্মীদের বিদেশ ভ্রমণ তো বটেই, এমনকি এক শহর থেকে অন্য শহরে গিয়ে মিটিং করার প্রবণতাও কমিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে জোর দিতে বলেছে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদক্ষেপ নিয়েছে হোম ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোম্পানি ‘হোমলেন’। সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকান্ত আইয়ার জানিয়েছেন, “অত্যাবশ্যকীয় ভ্রমণের জন্য আমরা কর্মীদের স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটের চেয়ে ট্রেন সংযোগ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছি।” এর ফলে জ্বালানি ও যাতায়াত খরচ দুই-ই বাঁচছে। পাশাপাশি, নতুন স্টোর খোলার মতো বড় সিদ্ধান্তগুলোর দায়িত্ব এখন স্থানীয় টিমের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের বারবার অন্য শহরে ছুটতে না হয়।

পরিবেশবান্ধব সাশ্রয়: নজর কাড়ছে আইটি সেক্টর
খরচ কমানোর এই লড়াইয়ে প্রযুক্তিকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে ক্যাপজেমিনি। কোম্পানিটি তাদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে দ্রুত বিদ্যুতায়িত করছে, অর্থাৎ তাদের বহরে যুক্ত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV)। শুধু তাই নয়, কোম্পানির এনার্জি কমান্ড সেন্টার (ECC)-এর মাধ্যমে আইওটি (IoT) প্রযুক্তির সাহায্যে রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে সমস্ত ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ব্যবহার, যাতে এক ইউনিট বিদ্যুৎও অপচয় না হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারের বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে ভারতীয় সংস্থাগুলোর এই সংযমী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ কেবল বর্তমান সংকট কাটানোই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তাদের আরও লাভজনক করে তুলবে।