“বিজেপি ছোঁবেও না, ওঁর ব্যবস্থা তৃণমূলই করবে!” নাম না করে অভিষেককে নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি তাপসের

২০২৬ সালের ঐতিহাসিক পালাবদলের পর নবগঠিত অষ্টাদশ বিধানসভার প্রথম অধিবেশনই হয়ে উঠল বেনজির রকমের অগ্নিগর্ভ। প্রথম দিনেই ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যখন শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই চলছিল, ঠিক তখনই ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাম না করে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন মানিকতলার হেভিওয়েট বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়। বিধানসভার অলিন্দে দাঁড়িয়ে তাঁর বিস্ফোরক দাবি, “বিজেপি তাঁর (অভিষেক) কিছু করবে না। ওঁর নিজের দলের লোক আর রাজ্যের জনগণই ওঁর ব্যবস্থা করবে।”
শুক্রবার বিধানসভার নতুন স্পিকার হিসেবে রথীন্দ্র বসু নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন দলের বিধায়করা যখন বক্তব্য রাখছিলেন, তখন নিজের বলার সুযোগ আসতেই আগাগোড়া তৃণমূলকে তুলোধোনা করেন একদা ঘাসফুল শিবিরের অন্যতম শীর্ষ নেতা তাপস রায়।
“দেখো দেখো, এবার দেখতে খারাপ লাগছে নাকি?”
নিজের বক্তব্য শুরু করার সময়ই বিরোধী আসনে বসা তৃণমূল বিধায়কদের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মুচকি হেসে এক চরম টিপ্পনী কাটেন তাপস রায়। তিনি বলেন, “দেখো, দেখো। অনেক তো করেছ। এবার কি দেখতে খারাপ লাগছে নাকি?” তাঁর এই খোঁচায় মুহূর্তের মধ্যে তেতে ওঠে বিরোধীদের বেঞ্চ। এর পরপরই ২০blank২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচনকে স্রেফ ক্ষমতার লড়াই মানতে নারাজ বিজেপি বিধায়ক বলেন, “এটা শুধুমাত্র সরকার গড়ার আর নির্বাচিত হয়ে আসার নির্বাচন ছিল না। এটা ছিল আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে এক পবিত্র ধর্মযুদ্ধ। আর সেই ধর্মযুদ্ধে অধর্মকে হারিয়ে যাঁরা জিতে এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে অভিনন্দন জানাই।”
আইন করে দেশবিরোধী স্লোগান বন্ধের দাবি, পাশে শুভেন্দু
নবনির্বাচিত স্পিকার রথীন্দ্র বসুর উদ্দেশে তাপস রায় কড়া দাবি তুলে বলেন, “স্যার, এই হাউসের পবিত্রতা রক্ষা করতে আপনাকে একটা বড় পদক্ষেপ করতে হবে। এই সদনে কোনো রকম রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়া চলবে না। প্রয়োজনে বিশেষ বিল এনে আইন করে এটা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।” তাপস রায়ের এই জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে আসন থেকে টেবিল চাপড়ে পূর্ণ সমর্থন জানান স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নাম না করে মমতা-অভিষেককে নজিরবিহীন তোপ
বিগত তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে মানিকতলার বিধায়ক বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ আজ শাপমুক্ত হয়েছে, পাপমুক্ত হয়েছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ ভয়মুক্ত হয়েছে।” ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হওয়া এবং সেখানে আইনজীবীর পোশাকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাজির হওয়াকে ইঙ্গিত করে তাপস বাবু বলেন, “গতকাল তো আবার কেউ কেউ হাইকোর্টেও গিয়েছিলেন!”
এর পরপরই সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন তিনি। তাপস রায় বলেন, “সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক—যদিও বাংলার একটা আঞ্চলিক দল, তার আবার সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক—তিনি ব্লক স্তর থেকে আমাদের বিজেপি প্রার্থীদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।” এই কথা শুনেই তৃণমূল বিধায়করা হাউসের ভেতর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে কড়া সুরে তাপস বলেন, “থামুন। সব বলা যায় এখানে, বলতে দিতে হবে। আমি তো কারও নাম করিনি। সেই ব্যক্তি বলেছিল বিজেপি কর্মীদের হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া হবে। আমি বলব, সে এবার একটু বাইরে বেরোক। বিজেপি তাঁর গায়ে হাতও দেবে না, ওঁর ব্যবস্থা জনগণ আর তৃণমূলের লোকেরাই করে দেবে।”
“আমরা না জিতলে ১৫০টি লাশ গুনতে হতো”
তৃণমূলের পক্ষে তোলা ভোট-পরবর্তী হিংসার পাল্টায় অতীতের রক্তক্ষয়ী রাজনীতির কথা মনে করিয়ে দেন তাপস রায়। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “নির্লজ্জ, বেহায়া না হলে আজকে ভোট-পরবর্তী হিংসার কথা এদের মুখে আসে! এর আগে বাংলায় একটাও রক্তপাতহীন, লাশহীন নির্বাচন এরা করতে পেরেছে? ভোটের পর রক্তের ওপর দিয়ে এরা ‘ভি’ সাইন (Victory Sign) দেখিয়েছে। স্যার, আজকে যদি এরা কোনোভাবে ক্ষমতায় ফিরে আসত, তবে অন্তত দেড়শোর ওপর বিজেপির লাশ আপনাকে গুনতে হতো। আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হতো এবং লক্ষ লক্ষ বিজেপি কর্মী-সমর্থক এতদিনে ঘরছাড়া থাকত।”
একসময় তৃণমূলে থাকা এবং বিগত একুশের নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে বরাহনগর থেকে জেতা তাপস রায় চব্বিশের লোকসভার আগে পদ্মশিবিরে যোগ দেন। নিজের রাজনৈতিক সততার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি শেষলগ্নে বলেন, “আমি যদি কোনোদিন কোনো ভোট-পরবর্তী হিংসায় জড়িত থাকি বা আমার নাম থাকে, তবে আমাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেবেন।” সবশেষে সমবেত কণ্ঠে “জয় শ্রীরাম, ভারত মাতার জয়” ধ্বনি দিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন বিজেপি বিধায়ক, যা নতুন বিধানসভার প্রথম দিনেই রাজনৈতিক উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।