ডিজেলের দাম ৫ টাকা বাড়লেই পকেটে টান! সাধারণ মানুষের ওপর কি তবে মুদ্রাস্ফীতির বড় কোপ?

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতা এবার ভারতের পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। আর এই আশঙ্কা সত্যি হলে কেবল পরিবহন সংস্থাই নয়, সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৫ টাকা বাড়লেই বাড়বে ভাড়ার বোঝা
রেটিং সংস্থা ক্রিসিল ইন্টেলিজেন্সের (CRISIL) একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধি পেলে পরিবহনকারীদের নিজেদের মুনাফা বজায় রাখতে ট্রাকের ভাড়া অন্তত ২.৫% থেকে ২.৮% পর্যন্ত বাড়াতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যবসা ইতিমধ্যেই প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে, সেখানে জ্বালানির এই বাড়তি দাম মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়াবে।
তেল কোম্পানিগুলোর রক্তক্ষরণ: প্রতিদিন ১,০০০ কোটি লোকসান
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম সত্ত্বেও দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম স্থিতিশীল রাখায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থাগুলো বড়সড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
দৈনিক লোকসান: ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের মতো সংস্থাগুলো প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা লোকসান করছে।
অনাদায়ের বোঝা: চলতি ত্রৈমাসিকে এই লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১.৯৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
সংকটে ক্ষুদ্র পরিবহনকারীরা
পরিবহন ব্যবসায়ীদের মতে, একটি ট্রাক চালানোর মোট খরচের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই ব্যয় হয় ডিজেলের পেছনে। ফলে তেলের দাম বাড়লে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে যাঁদের একটি মাত্র ট্রাক আছে, তাঁদের ব্যবসা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনেক মালিকের দাবি, বাজারে ট্রাকের আধিক্য থাকলেও মালের চাহিদা কম, ফলে জ্বালানির বাড়তি খরচের পুরোটা তাঁরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করতে পারছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাত্র ৮০ শতাংশ খরচ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাঁদের লভ্যাংশের ওপর।
পণ্য চলাচলে মন্দার ইঙ্গিত
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের পণ্য চলাচলের গতিও মন্থর হয়েছে। ক্রিসিলের সর্বভারতীয় মালবাহী সূচক মার্চ মাসের ১০১.৪ থেকে এপ্রিল মাসে ১০০.৫-এ নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে ফাস্টট্যাগ (FASTag) লেনদেন কমাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাস্তাঘাটে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। টায়ার, টোল ট্যাক্স এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মুদ্রাস্ফীতির অশনি সংকেত
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ডিজেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল লজিস্টিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাকের ভাড়া বাড়লে সবজি, ফল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও লাফিয়ে বাড়বে। এর ফলে দেশে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি বা বাজারের আগুন দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।