নিষিদ্ধ রাজনীতি চলবে না! ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের মাঝে রাশিয়ার সামনেই পশ্চিমীদের কড়া বার্তা দিলেন জয়শঙ্কর

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে দাঁড়িয়ে ভারত স্পষ্ট করে দিল যে, কোনো সমস্যার সমাধান বন্দুকের নল বা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা হতে পারে না। বৃহস্পতিবার নয়া দিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর পশ্চিমী দুনিয়া থেকে শুরু করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র— সকলকে একযোগে কড়া বার্তা দিলেন। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ— প্রতিটি বিষয়ে ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ় ও সরাসরি।
লোহিত সাগরে নজর, জ্বালানি সংকটে উদ্বেগ
জয়শঙ্করের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরে চলা অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক বিঘ্ন এবং জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর কোনো রকম আঘাত বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করতে পারে। ইরান সংকট এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা যে কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক বিপদ, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
গাজা ও মানবিক সংকটে ভারতের অবস্থান
বৈঠকে ভারত গাজার মানবিক পরিস্থিতির কথা উত্থাপন করে সরাসরি জানায় যে, এই সংকটকে আর উপেক্ষা করা অসম্ভব। ভারত অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশাধিকার এবং ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ বা টু-স্টেট সলিউশনের প্রতি পুনরায় সমর্থন জানিয়েছে। লেবানন, সিরিয়া, সুদান এবং ইয়েমেনের পরিস্থিতি উল্লেখ করে জয়শঙ্কর মনে করিয়ে দেন যে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রধান শত্রু।
আমেরিকাকে পরোক্ষ নিশানা: নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি নিয়ে তোপ
বৈঠকের অন্যতম চমকপ্রদ দিক ছিল একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ভারতের কড়া অবস্থান। কোনো দেশের নাম না করে জয়শঙ্কর বলেন, জাতিসংঘ সনদের বাইরে গিয়ে আরোপ করা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ‘স্যাংশন’ আসলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। তাঁর মতে, চাপ প্রয়োগের রাজনীতি বা একতরফা নিষেধাজ্ঞা কখনো সংলাপের বিকল্প হতে পারে না। ব্রিকস মঞ্চে দাঁড়িয়ে জয়শঙ্করের এই মন্তব্য রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমী দেশগুলোর নীতির প্রতি ভারতের স্পষ্ট অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল।
সন্ত্রাসবাদে ‘জিরো টলারেন্স’ ও রাষ্ট্রপুঞ্জ সংস্কার
বরাবরের মতোই সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ভারতকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা গেছে। জয়শঙ্কর সাফ জানিয়েছেন, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করে এবং এই বিষয়ের প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ এখন সারা বিশ্বের জন্য একটি সার্বজনীন মানদণ্ড হওয়া উচিত। পাশাপাশি, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ নিয়ে তাঁর দাবি ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি বলেন, “জাতিসংঘের সংস্কার আর স্থগিত রাখা যাবে না, কারণ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আর আগের মতো নেই।”
সব মিলিয়ে, নয়া দিল্লির এই বৈঠক থেকে ভারত নিজেকে বিশ্বের এমন এক ‘ভয়েস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল, যারা যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি এবং একপাক্ষিক খবরদারির পরিবর্তে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে। জয়শঙ্করের এই ‘ডিজিটাল ডিপ্লোম্যাসি’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দারুণভাবে ভাইরাল।