মোহনবাগানের মাথার ওপর থেকে সরে গেল বটগাছের ছায়া, চিরনিদ্রায় ময়দানের ‘কল্পতরু’ টুটু বসু!

সবুজ-মেরুন গ্যালারিতে যখন স্লোগান ওঠে ‘সোনায় লেখা ইতিহাসে’, তখন অজান্তেই যাঁর মুখটা ভেসে ওঠে, তিনি আর নেই। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৭৮ বছর বয়সে পরলোকগমন করলেন মোহনবাগানের প্রবাদপ্রতিম কর্তা এবং ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি টুটু বসু। গতকাল রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা ময়দান।
অসময়ের অকৃত্রিম বন্ধু
টুটু বসু মানেই ছিল মোহনবাগানের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়। আটের দশকের শেষে যখন ক্লাব চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ‘মোহনবাগান ফোরাম’-এর হাত ধরে হাল ধরেছিলেন টুটু বসু ও অঞ্জন মিত্র। ১৯৯০ সালে কার্যকরী কমিটিতে প্রবেশ এবং ধীরেন দে-র বিদায়ের পর সচিবের দায়িত্ব সামলানো— টুটু বসুর হাত ধরেই বাগান আধুনিক ফুটবলের দিকে পা বাড়াতে শুরু করে।
চিমার সেই গল্প ও মনোরঞ্জন-কৃশানু যুগ
১৯৯১ সালে সভাপতি হওয়ার পর তাঁর হাত ধরেই বাগানে আসেন বিদেশী ফুটবলার চিমা ওকোরি। ময়দানে আজও মুখে মুখে ঘোরে সেই গল্প— চিমার সন্তান টুটুবাবুর কোলে প্রস্রাব করে দিয়েছিল, আর তিনি হাসিমুখে সেই আবদার সয়ে নিয়েছিলেন। এরপর মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে কোচ করা কিংবা কৃশানু-বিকাশ জুটিকে সই করানো— টুটু বসুর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মাস্টারস্ট্রোক।
নিজেকে উজাড় করে ক্লাব রক্ষা
টুটু বসুর ফুটবলার প্রীতির চেয়েও বড় ছিল তাঁর ক্লাব প্রেম। ২০১২ সালের সেই স্মৃতি আজও সমর্থকদের চোখে জল আনে। ডার্বিতে রহিম নবি আহত হওয়ার পর দল তুলে নেয় মোহনবাগান। ফেডারেশন যখন ক্লাবকে আজীবনের জন্য নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন টুটু বসু। দিল্লি উড়ে গিয়ে তৎকালীন ফেডারেশন প্রধান প্রফুল্ল প্যাটেলের হাতে নিজের ব্যক্তিগত বন্ড ভাঙিয়ে ২ কোটি টাকা জরিমানার অর্থ তুলে দিয়েছিলেন তিনি। শুধুমাত্র ক্লাবকে নির্বাসন থেকে বাঁচাতে নিজের সঞ্চয় বিলিয়ে দিতে দু’বার ভাবেননি তিনি।
শোকাতুর রাজনৈতিক ও ক্রীড়া মহল
গতকালই অসুস্থ টুটু বসুকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক এবং এআইএফএফ সচিব কল্যাণ চৌবে। তাঁর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজ নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাতে মৃত্যুর খবর আসতেই মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— সকলেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
আজ সকালে বালিগঞ্জের বাসভবনে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় জমান অগুনতি সমর্থক। প্রিয় কর্তার ছবিতে মাল্যদান করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন মোহনবাগানের ঘরের ছেলে সুব্রত ভট্টাচার্য।
টুটু বসুর প্রয়াণে সবুজ-মেরুন নৌকার পাল আজ যেন কিছুটা ঝুলে পড়ল। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ থেকে ক্লাবকে বুক দিয়ে রক্ষা করার সেই দক্ষ ‘নাবিক’ কি আর পাবে ময়দান? প্রশ্নটা রেখেই ওপারে পাড়ি দিলেন বাগান অন্ত প্রাণ এই চিরসবুজ ব্যক্তিত্ব।