“১৫০০ টাকায় আর ভুলল না মন!”-কোন রাগে মমতার ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ফিরিয়ে দিলেন বাংলার নারীরা?

ভারতীয় রাজনীতিতে ইদানীং একটি ধারণা প্রবল হয়েছিল— মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছে দিলেই কেল্লাফতে! অসমের ‘অরুণোদয়’ বা বিহারের ক্যাশ স্কিম অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর বাংলা যেন মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখাল। মাসে ১৫০০ টাকা দিয়েও শেষরক্ষা হলো না তৃণমূলের। ১৫ বছরের জমানার অবসান ঘটিয়ে নবান্ন দখল করল বিজেপি। আর এই পতনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে ‘মহিলা ভোটব্যাঙ্ক’-এর সরে যাওয়া।

দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলার নারীশক্তি মমতার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরটা লুকিয়ে আছে গত কয়েক মাসের উত্তাল পরিস্থিতি আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মধ্যে।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম আত্মসম্মান: লড়াইটা ছিল পরিচয়ের

বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্য ছিল আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে বাংলার অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিজের ক্ষমতার চাবিকাঠি করে রাখা। কিন্তু ভোটের ফলাফল বলছে, বাংলার মহিলারা ১৫০০ টাকার চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া টাকা যে মৌলিক অধিকারের ক্ষতে মলম লাগাতে পারে না, তা ইভিএমে বুঝিয়ে দিয়েছে জেন-জি থেকে শুরু করে গৃহবধূরা।

আরজি কর: যেখানে ধসে গেল ‘দিদি’র ভাবমূর্তি

আরজি কর মেডিকেল কলেজের নৃশংস ঘটনা শুধু একটি অপরাধ ছিল না, তা ছিল রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট আঘাত। যে ‘দিদি’কে বাংলার মেয়েরা নিজেদের প্রধান রক্ষাকর্তা বলে মনে করত, সেই সরকারের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাট ও ‘কভার ফায়ার’ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী যখন পুলিশের ভূমিকাকে সমর্থন করতে নামেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বার্তা যায়— একজন চিকিৎসক যদি নিজের কর্মস্থলেই নিরাপদ না হন, তবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাহাত্ম্য কোথায়? এই প্রশ্নই বদলে দিয়েছে ভোটের সমীকরণ।

সন্দেশখালি ও নারী নির্যাতনের রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা

সন্দেশখালি থেকে আরজি কর— বারবার মহিলাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের ঘটনাকে ‘রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছে শাসকদল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্যাতিতার কান্নাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ছিল তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ভুল। বাংলার সচেতন নারী সমাজ এই উদাসীনতাকে মেনে নেয়নি।

এম-ফ্যাক্টরের ফাটল

তৃণমূলের জয়ের প্রধান দুটি স্তম্ভ ছিল— মুসলিম ভোট ও মহিলা ভোট। এবারের নির্বাচনে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক মমতার পাশে থাকলেও, দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ মহিলা ভোট সম্পূর্ণ ধসে গিয়েছে। বিশেষ করে শহুরে এবং শিক্ষিত নারী সমাজ ঢেলে ভোট দিয়েছে বিজেপিকে।

পরিণাম? ১০০ আসনের গণ্ডিও পেরোতে পারল না তৃণমূল। আরজি করের সেই ‘রাত দখল’ কর্মসূচির আগুন যে শেষ পর্যন্ত নবান্নের কুর্সি পুড়িয়ে খাক করে দেবে, তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি ঘাসফুল শিবির।