২০২৬ নির্বাচনের আগে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তীব্র উদ্বেগ! ৪৪ হাজার ‘অমীমাংসিত’ ভোটারের কারণে বড় পরীক্ষার মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কি নিজের খাসতালুক কলকাতা দক্ষিণ জেলার ১৫৯-ভবানীপুর কেন্দ্রে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)? নির্বাচন কমিশনের সদ্য প্রকাশিত ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক তথ্যে সেই প্রশ্ন নতুন করে জোরালো হয়েছে।

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, নন্দীগ্রামের পর এবার ভবানীপুরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘প্রাক্তন’ করবেন তিনি। এতদিন যা নিছক রাজনৈতিক হুঙ্কার মনে করা হলেও, SIR রিপোর্টের পরিসংখ্যান এবং গত লোকসভা নির্বাচনের ওয়ার্ড-ভিত্তিক ফলাফল শুভেন্দুর দাবিকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে।

৪৫ হাজার ‘জিজ্ঞাসা চিহ্ন’: অঙ্কের জটিলতা

সম্প্রতি প্রকাশিত SIR স্ট্যাটাস রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ২ লক্ষ ০৬ হাজার ২৯৫ ভোটারের মধ্যে মাত্র ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৫০৯ জনের তথ্য ডিজিটাইজড বা ভেরিফায়েড হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪৪ হাজার ৭৮৬ জন ভোটারের নামের পাশে এখনও ‘পেন্ডিং’ বা ‘অমীমাংসিত’ স্ট্যাটাস ঝুলে আছে। শতাংশের হিসাবে যা মোট ভোটারের প্রায় ২১.৭১ শতাংশ।

প্রশাসনিকভাবে এটি ‘নাম বাদ’ না হলেও, এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই না হওয়া শাসক দলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ, এই ৪৪ হাজারের সংখ্যাটি ভবানীপুরের নির্বাচনী পাটিগণিতে ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে।

২০২১ সালের জয়ের ব্যবধান ও ৪৪ হাজারের ‘সুইং ফ্যাক্টর’

৪৫ হাজার অমীমাংসিত ভোটারের এই সংখ্যাটি তৃণমূলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। কারণ:

২০২১ বিধানসভা নির্বাচন: তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এই আসনে জিতেছিলেন ২৮ হাজার ৭১৯ ভোটে। SIR-এর পেন্ডিং সংখ্যাটি এই জয়ের ব্যবধানের প্রায় দেড়গুণ বেশি।

উপ-নির্বাচন (২০২১): খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছিলেন ৫৮ হাজার ৮৩৫ ভোটে। পেন্ডিং তালিকাটি তাঁর জয়ের ব্যবধানের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমান।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি এই ৪৪ হাজার ভোটারের একটি বড় অংশ চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং তারা যদি শাসক দলের সমর্থক হন, তবে ২০২৬-এ ভবানীপুরের মাটি আর ততটা শক্ত থাকবে না।

লোকসভা ভোটের ফলাফলে ৫ ওয়ার্ডে পিছিয়ে থাকা

‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে কাজ করছে লোকসভা নির্বাচনের ওয়ার্ড-ভিত্তিক ফলাফল। ওই নির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত ৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫টিতেই (ওয়ার্ড ৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ও ৭৪) তৃণমূল কংগ্রেস পিছিয়ে ছিল। এই ওয়ার্ডগুলি মূলত অবাঙালি এবং ব্যবসায়ী অধ্যুষিত, যেখানে বিজেপির প্রভাব স্পষ্ট।

প্রশ্ন উঠেছে, SIR রিপোর্টে সংশয় তৈরি হওয়া ৪৪ হাজার ভোটার কি মূলত এই পিছিয়ে পড়া ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দা, নাকি তৃণমূলের শক্তিশালী ঘাঁটি (বাকি ৩টি ওয়ার্ড ও বস্তি এলাকা) থেকে এই নামগুলো উঠে এসেছে? যদি শক্তিশালী ঘাঁটিতেই ‘ভেরিফিকেশন’-এ কড়াকড়ি হয়, তবে ২০২৬-এর লড়াই মমতার জন্য কঠিন হতে পারে।

শুভেন্দু অধিকারীর হুঙ্কার, লোকসভার ৫ ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়া এবং ৪৪ হাজার ‘অনিশ্চিত’ ভোটার—এই তিনে মিলে ভবানীপুরের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। শাসক দলের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল প্রশাসনিক স্তরে এই ভোটারদের তথ্য দ্রুত যাচাই করে তাঁদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, যাতে ‘নাম বাদ’-এর গেরোয় তাদের ভোটব্যাঙ্কে ধস না-নামে।