গুটখা-খৈনিতে হু হু করে বাড়ছে মৃত্যু! ভারত ও বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম সতর্কবার্তা!

গুটখা, খৈনি বা জর্দার মতো চিবিয়ে খাওয়ার তামাকের নেশা যে কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এল সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। তামাক ও খৈনির জেরে ভারত ও বাংলাদেশে হু হু করে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ (GBD) ২০২৩ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে চিবিয়ে খাওয়ার তামাকের কারণে আনুমানিক ২ লক্ষ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতেই প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৪ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে তামাক ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (IHME)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০২৩ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ২৪ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ চিবিয়ে খাওয়ার তামাক ব্যবহার করেছেন। বিশ্বজুড়ে এই বয়সের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩.৯ শতাংশ হলেও, পুরুষদের মধ্যে এই প্রবণতা মহিলাদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোনো দেশেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি, বরং ২৪টি দেশে তা উল্টে আরও বেড়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বস্বান্ত করছে নেশা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। ২০২৩ সালে এই অঞ্চলে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে চিবিয়ে খাওয়ার তামাক ব্যবহারের হার ছিল ১৪.৬ শতাংশ। দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, পালাউয়ে এই হার ২৪.৪ শতাংশ, বাংলাদেশে ২৩.৪ শতাংশ এবং নেপালে ১৭.৫ শতাংশ। ভারতও এই সর্বনাশা সমস্যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পুরুষ ও মহিলা উভয় ক্ষেত্রেই তামাকজনিত মৃত্যু এবং অসুস্থতার বোঝা বহনকারী শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ছবিটা আরও ভিন্ন; সেখানে ৩০ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার পুরুষদের তুলায় বেশি দেখা গেছে।
স্ট্রোক ও ক্যানসারের বড় কারণ তামাক চিবিয়ে খাওয়ার তামাক ব্যবহারের ফলে শরীরে বাসা বাঁধছে স্ট্রোক, ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসার, খাদ্যনালি, গলবিল, স্বরযন্ত্র এবং নাকের পিছনের অংশের ক্যানসারের মতো মারণ রোগ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বজুড়ে তামাকজনিত স্বাস্থ্যক্ষতির সবচেয়ে বড় কারণ স্ট্রোক। এছাড়া ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের মোট স্বাস্থ্যক্ষতির ১৭.৩ শতাংশের জন্য দায়ী এই তামাক, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় এই অনুপাত মারাত্মকভাবে বেড়ে ৩০.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তিন দশকে বেড়েছে স্বাস্থ্যক্ষতি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চিবিয়ে খাওয়ার তামাকের কারণে হারানো সুস্থ জীবনের পরিমাণ বা ‘ডালিস’ (DALYs) ১১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে এই স্বাস্থ্যক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৪ লক্ষ ৮০ হাজার বছর, যার সিংহভাগই ছিল অকালমৃত্যুর ফল। গবেষকদের মতে, তামাকের বিরুদ্ধে প্রচলিত সচেতনতা প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস এবং লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যগুলিকে মাথায় রেখে আরও কড়া ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, অন্যথায় আগামী দিনে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।