‘জল মাতা’ অমলা অশোক রুইয়ার গল্প, কীভাবে একটি ছোট চেক ড্যাম বদলে দিল ১৯ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকা!

সমাজকর্মী অমলা অশোক রুইয়ার চোখে-মুখে নেই কোনও তাড়াহুড়ো, আছে শুধু গ্রামীণ ভারতের জল-সংকটের সত্য আবিষ্কারের আত্মবিশ্বাস। সদ্য রামোজি গ্রুপ দ্বারা ‘রামোজি এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড ইন রুরাল ডেভেলপমেন্ট-২০২৫’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় এই ‘জল মাতা’। তাঁর জীবনের গল্প শুধু জলের গভীরতায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি ধারণার সফল বাস্তবায়ন, যা একটি অঞ্চলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

এক বিশ্লেষকের মতোই প্রবীণ অমলা মনে করিয়ে দেন, ন’য়ের দশকের শেষের দিকে রাজস্থানের খরার ভয়াবহতা। ইটিভি ভারতকে তিনি জানান, তৎকালীন ত্রাণকার্যকে তাঁর কাছে ‘ব্যান্ড-এইড’-এর মতো মনে হয়েছিল। তাঁর উপলব্ধি ছিল, জলের অভাব নয়, বরং সংরক্ষণের অভাবই মূল সমস্যা। মুম্বইতে বসে টিভিতে যখন দেখতেন মহিলারা প্রখর রোদের মধ্যে বহু কিলোমিটার হেঁটে জলের খোঁজ করছেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, “বর্ষার জল কেন আমরা ধরে রাখতে পারি না?”

এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় বাস্তব সমাধান। একদল জল বিশেষজ্ঞের মতামতকে অবাস্তব মনে হওয়ায়, তিনি এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার শরণাপন্ন হন, যারা জমির ঢালকে ব্যবহার করে কৌশলে জল সংগ্রহের কাজ করত। তিনি বুঝতে পারেন, এই পদ্ধতি নতুন নয়, বরং পূর্বপুরুষরা এর চেয়েও ভালো বুঝতেন।

নিজের কাজে স্বাধীন থাকার জন্য ২০০৩ সালে অমলা স্থাপন করেন ‘আকার চেরিটেবল ট্রাস্ট’। তাঁর জল সংগ্রহের মডেলটি গ্রামীণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক দুর্দান্ত উদাহরণ—গ্রামের ‘চেক ড্যাম’। এটি এক ধরনের স্পিড ব্রেকার, যা বৃষ্টির জলকে ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধি করে। অমলার সরল প্রশ্ন, “ছোট বাঁধগুলি যখন সব বদলে দিতে পারে, তখন বড় বাঁধের দরকার কী?”

তাঁর ট্রাস্টের কাজের পরিসংখ্যান চমকে দেওয়ার মতো:

১ হাজার ৩০৮ টি জলাশয় নির্মাণ।

১ হাজার ৩৫৩টি গ্রামের রূপান্তর।

১.৯ মিলিয়ন (১৯ লক্ষ) মানুষের জীবন প্রভাবিত।

আর্থিক মুনাফা বার্ষিক ৩ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০০৬ সালে মুণ্ডাওয়ারা গ্রামে প্রথম প্রকল্পটি সাফল্যের চেয়েও বেশি কিছু এনে দেয়। জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় কূপগুলি পূর্ণ হয়, জমিতে ফসল ফলতে শুরু করে। মহিলারা আয় করতে শুরু করলে স্কুলে ভর্তির হার বৃদ্ধি পায় এবং মেয়েরা স্কুলে যেতে শুরু করায় সমগ্র সমাজের শ্রেণিবিন্যাস বদলে যায়!

আকার ট্রাস্টের কৌশল: মালিকানা। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ গ্রামবাসীদের নিজেদের দিতে হয়। এর কারণ ব্যাখ্যা করে অমলা বলেন, “মালিকানা দায়িত্ববোধ তৈরি করে। আর মালিকানা প্রকল্পকে স্থায়ী করে তোলে।” গ্রামবাসীরা নিজেদের অর্থে বিনিয়োগ করায়, তাঁরাই এই সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন এবং জলের অপব্যবহার বন্ধ হয়।

‘জল মাতা’ অমলার এখনকার লক্ষ্য জল সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন এবং জীবিকা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা। তাঁর কথায়: “জল হল তার সূচনা। শিক্ষা হল ধারাবাহিকতা। আর মর্যাদা হল ফলাফল।” তিনি বিশ্বাস করেন, বড় বড় প্রযুক্তিগত সমাধানের বদলে অতীতে থাকা সাশ্রয়ী কৌশলগুলিই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারে। তাঁর দল এখন দেশের অন্যান্য খরাপ্রবণ রাজ্যগুলিতে জল সচেতনতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রসারণের আশা করছে।