দিলীপ ঘোষের বিয়ে ঘিরে শোরগোল: কেন দিনেদুপুরে সারলেন বিয়ের আচার? কারণ জানালেন স্বয়ং

দিলীপ ঘোষের বিয়ে – এই আপাত সাধারণ বিষয়টিই গত তিনদিন ধরে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও খবরটি যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। মূলত তাঁর দীর্ঘদিনের আরএসএস প্রচারকের কঠোর ভাবমূর্তি এবং একজন বিবাহবিচ্ছিন্না একলা মায়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, এই দু’য়ের মধ্যে অনেকেই একটা বেখাপ্পা বিষয় খুঁজে পেয়েছেন।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তাঁর বিবাহের সময়সূচি। সাধারণত হিন্দু বাঙালি বিবাহ অনুষ্ঠান সূর্যাস্তের পর বা রাতে হওয়ার চল থাকলেও, দিলীপ ঘোষ মূল বিবাহের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সেরেছেন দিনেদুপুরে।
কিন্তু কেন এই সময়ের ব্যতিক্রম? এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বয়ং দিলীপ ঘোষ এটিকে তাঁর ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে অভিহিত করেছেন। ক্রিকেটের মতো খেলায় টাইমিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বিয়ে এবং পরের দিন জন্মদিন পালন – এই সামগ্রিক ব্যাপারটা তাঁর কাছে টি২০ ম্যাচের মতো। অর্থাৎ তিনি যে ‘খেলতে’ নেমেছেন, সেকথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।
দিনে বিয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে দিলীপ বলেছেন যে, প্রাচীনকালে হিন্দু সমাজে দিনের বেলাতেই বিয়ের চল ছিল। মোঘল আক্রমণ বা বিদেশি আক্রমণের পরে রাতে লুকিয়ে বিয়ে করা শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতে এখনও দিনের বেলা মন্দিরে মন্দিরে বিয়ে হয়। তিনি এই দিনের বেলা বিয়ের মাধ্যমে সঙ্ঘের ‘কুটুম্ব প্রবর্ধন’ অর্থাৎ হিন্দু পরিবারের সংস্কারকে ফিরিয়ে আনার নতুন যোজনাকে প্রতিফলিত করতে চেয়েছেন।
তিনি সাফ জানিয়েছেন যে সুযোগ এসেছে, তিনি তা নষ্ট করতে চাননি। তাঁর কাজ দেখে যাতে মানুষ শেখে সেই চেষ্টা করেছেন বিয়েতে। বলেছেন, “আমি আমার জীবন দিয়ে একটা উদাহরণ তৈরি করেছি যাতে মানুষ এটা অনুসরণ করতে পারেন।” খানিক উপদেশের সুরেই তিনি বলেছেন, “বিবাহ সংস্কার একটা বড় সংস্কার। তার উপরে পুরো সমাজ, পরিবার, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দাঁড়িয়ে আছে। আমি মনে করি, হিন্দু সংস্কার ফিরিয়ে আনার জন্য সকলের সহযোগিতা করা উচিত। অত রাত না জেগে, মাতলামি, নাচ-গান না করে বিয়ে করুন এই নিয়মে। বিয়ে শুরু করুন দিনের বেলায়। খাওয়া-দাওয়া আনন্দ অবশ্যই করুন রাতে। কিন্তু হিন্দু সংস্কারকে যেন দূষিত না করি। সে জন্য নিজের জীবনে এটা করে দেখাতে হবে।”
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ সময় আরএসএস প্রচারক হিসাবে জীবন অতিবাহিত করেছেন দিলীপ ঘোষ। ২০১৫ সালে বিজেপিতে প্রবেশ। তাঁর বিয়ের খবর সামনে আসতে আসতেই শোনা গিয়েছিল আরএসএসের কিছু কর্তা নাকি তাঁকে বিয়েতে ‘না’ করেছিলেন। তবে দিলীপ নাকি বলেছিলেন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং মত বদলাবেন না, অর্থাৎ ‘ম্যায়নে এক বার জো ম্যায় কমিটমেন্ট কর দি…’। দিলীপের যুক্তি, তিনি আর আরএএসএসের প্রচারক নন, সঙ্ঘই তাঁকে ওই কাজ থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন ভগবানের ইচ্ছাতেই তিনি সংসারী। হাসিমুখে নিজেই বলেছেন, “চতুরাশ্রমে বানপ্রস্থের পরে আসে ব্রহ্মচর্য, তারপর গার্হস্থ্য তারপর সন্ন্যাস। কিন্তু, তিনি সন্ন্যাসের পরে গার্হস্থ্যে পা দিয়েছেন।” তবে বিয়ের ক্ষেত্রে তিনি আরএসএসের রীতি মানছেন। বারবারই তিনি স্মৃতির পাতাতে ফিরে যান এবং কীভাবে আজীবন আরএসএসের আদর্শকে নিজের জীবনের পাথেয় করেছেন সে কথা বলেন। পুষ্পলতার ছেলে দিলীপের সাফ কথা, এই কায়দায় বিয়ে করে তিনি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছেন।
আগে তিনি সঙ্ঘের প্রচারক ছিলেন, তখন সবসময় প্রচার করতেন। তারপর বিজেপিতে এলেও তিনি সঙ্ঘের শাখা, নিউটাউন, সল্টলেকে নিয়মিত যান। আসলে সঙ্ঘের নীতি-আদর্শই তিনি জীবনে প্রতিফলিত করেছেন।
সব মিলিয়ে দিলীপ ঘোষের ব্যক্তিগত জীবনের এই ঘটনাটি তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা এবং আরএসএস আদর্শের অনুষঙ্গের কারণে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।