মুর্শিদাবাদে হিংসার আগুন: বাংলাদেশের জঙ্গিদের আনাগোনা? এনআইএ তদন্তের দাবিতে সরব এলাকাবাসী

মুর্শিদাবাদে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া লাগাতার হিংসার ঘটনায় ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। সুতি থেকে জঙ্গিপুর পর্যন্ত একের পর এক এলাকায় দেখা গেছে তাণ্ডবের ছবি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামশেরগঞ্জের একাধিক অঞ্চল। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, লুটপাট, এমনকি গ্যাসের সিলিন্ডার খুলে বাড়িঘর ধ্বংস করার মতো অভিযোগ উঠেছে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। হামলার ধরনে একটি নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ লক্ষ্য করা গেছে, যা জন্ম দিয়েছে একাধিক প্রশ্নের। বারবার উঠে আসছে ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মুখেও শোনা গেছে একই কথা। কিন্তু কারা এই বহিরাগত? সীমান্ত পেরিয়েই কি এপারে ঢুকছে ‘ওরা’?
গোয়েন্দা রিপোর্টে সিঁদুরে মেঘ
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি সূত্র অনুযায়ী মুর্শিদাবাদের ঘটনায় বাংলাদেশের হাত রয়েছে। নেতাজি ইন্ডোরে ইমামদের সভায় তিনি এ নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন সীমান্ত পেরিয়ে লোক ঢুকতে দেওয়া হলো, যেখানে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব বিএসএফের।
অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্যরা। খোদ রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসও জাফরাবাদে গিয়েছিলেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করেছেন। এলাকার মানুষজন স্থায়ী বিএসএফ ক্যাম্পের দাবি জানিয়েছে।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
মুর্শিদাবাদকাণ্ডে এনআইএ তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। একই দাবি উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফেও। ঘটনার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাড়ি কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও কেন তারা কিছুই টের পেলেন না, সেই প্রশ্নও উঠছে। জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান এবং সাগরদিঘির বিধায়ক বাইরন বিশ্বাস জানিয়েছেন, তারা আগে থেকে কিছুই আঁচ করতে পারেননি।
‘পেশাদার দুষ্কৃতী’?
তদন্তের জন্য সিট গঠন করা হয়েছে এবং হরগোবিন্দ ও চন্দন খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত দিলদার নাদাবের ভূমিকা রহস্য ঘনীভূত করেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, দিলদারের সঙ্গে বাংলাদেশ যোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলার ধরন দেখে তদন্তকারীরা ‘পেশাদার দুষ্কৃতীদের’ জড়িত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। যেভাবে সিসিটিভি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে হামলা চালানো হয়েছে, তা ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান মনে করেন, হামলাকারীরা প্রায় সকলেই বহিরাগত। ফরাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলামও একই মত পোষণ করেন। তার বাড়িতেও হামলা হয়েছে, যা থানা থেকে খুব কাছে অবস্থিত।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সীমান্ত পরিস্থিতি
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। ধরা পড়েছে বহু অনুপ্রবেশকারী, যাদের কাছে জাল ভারতীয় পরিচয়পত্রও পাওয়া গেছে। বেড়েছে দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য। নজরদারি বাড়িয়েছে বিএসএফ। তবে কাঁটাতারহীন সীমান্ত এলাকাগুলি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা রিপোর্টেও সিঁদুরে মেঘ দেখা গেছে। ধুলিয়ান, সুতি, সামশেরগঞ্জের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে অস্থিরতা বেশি দেখা গেছে। এই এলাকাগুলি অস্ত্র ও মাদক পাচারের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
গোয়েন্দা রিপোর্টে জেএমবি ও এবিটির মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর সক্রিয়তারও উল্লেখ রয়েছে। মুর্শিদাবাদের জেলে বন্দি জেএমবি জঙ্গি তারিকূলের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। এমনকি বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিমুদ্দিন রহমানির সাম্প্রতিক মুর্শিদাবাদ সফরের কথাও উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমাজবিরোধী কার্যকলাপের পাশাপাশি মৌলবাদীদের দাপট সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে কারা ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমেছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শুভেন্দু অধিকারী সহ স্থানীয় বাসিন্দারা এনআইএ তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন এবং স্থায়ী বিএসএফ ক্যাম্প স্থাপনের উপর জোর দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার জল কতদূর গড়ায়।