“স্যর আমরা কী দোষ করেছি?”-ভালোবাসার টানেই স্কুলে গেলেন চাকরিহারা শিক্ষক শুভদীপ

রায়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন, সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আর স্কুলের পথে পা বাড়াবেন না। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের ব্যাকুল অনুরোধ তাঁকে সেই সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে দেয়নি। বারবার ফোনের ওপারে ভেসে আসা প্রশ্ন, “স্যর আমরা কী দোষ করেছি? আমাদের শাস্তি দিচ্ছেন কেন?”—এই আকুতি নাড়িয়ে দিয়েছে শুভদীপ পালকে। তাদের ভালোবাসার টানে ফের স্কুলে ফিরেছেন তিনি, তবে লড়াই ছাড়েননি।
বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের বাসিন্দা শুভদীপ ২০১৯ সালে নানুর সংলগ্ন পূর্ব বর্ধমানের গোন্নাসেরান্দি হাইস্কুলে রসায়নের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ৫৫০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য বরাদ্দ ১৭ জন শিক্ষকের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি গিয়েছে একমাত্র শুভদীপের। আর এতেই বিপাকে পড়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। কারণ পড়ানো ছাড়াও খেলাধুলো থেকে শুরু করে স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি।
ওই স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের অনুমোদন না থাকায় উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের স্কুল ছেড়ে দূরে যেতে হত। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছিল শুভদীপকে। তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করার প্রস্তাব দেন এবং সেই দায়িত্ব পান। সহকর্মীদের নিয়ে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি সহ পরিকাঠামো গড়ে তোলেন, যা সরকারি পরিদর্শনে প্রশংসিতও হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিজ্ঞান বিভাগের অনুমোদন এখন সময়ের অপেক্ষা।
স্বাভাবিকভাবেই এমন শিক্ষককে হারাতে রাজি নয় ছাত্রছাত্রীরা। দশম শ্রেণির সুপর্ণা সূত্রধর, পৌলমী ঘোষ, নবম শ্রেণির সৌমাল্য ধারারা জানায়, “স্যরকে আমরা সবেতেই পাশে পাই। তিনি স্কুলে আসবেন না, তা ভাবতেই পারছি না।” একই সুর প্রাক্তনীদের কণ্ঠেও। খুজুটিপাড়া হাইস্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সুখেন থান্দার, নানুর হাইস্কুলের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুরজিৎ মণ্ডলরা বলে, “বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য মাধ্যমিকের পরে স্কুল ছেড়ে আসতে হয়েছিল। কিন্তু স্যরের সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ হয়নি। পড়াশোনার ব্যাপারে যখনই কোনও সমস্যায় পড়েছি, স্যরের কাছে ছুটে গিয়েছি অথবা ফোন করেছি। স্যর হাসিমুখে সমাধান করে দিয়েছেন, একটুও বিরক্ত হননি।”
স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিমাদ্রিশেখর গুপ্ত বলেন, “তাঁর মতো ছাত্রদরদী শিক্ষক কমই হন। স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে তিনি ভীষণভাবে উদ্যোগী হয়েছিলেন।”
শুভদীপের আয়ের উপর নির্ভরশীল চারজনের সংসার। মাস দুয়েক আগে বিয়ে করেছেন, ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করেছেন, যার প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে নলহাটির লোহাপুর এমআরএম হাইস্কুলে নবম-দশমের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। নভেম্বরে সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষক হিসেবে গোন্নাসেরান্দিতে যোগদান করেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আপার প্রাইমারি, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টাফ সিলেকশন কমিশন, ডব্লিউবিপিএইচসি-তেও চাকরি পেয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে বাড়িতে টিউশন শুরু করেছেন।
আক্ষেপের সুরে শুভদীপ বলেন, “ছাত্রছাত্রীদের টানে স্কুলে যেতেই হবে। বাড়ি থেকে মোটরবাইকে ১৯ কিমি দূরের স্কুলে যেতে একটা খরচ তো আছেই। যতদিন কিছু সমাধান না হয়, ততদিন কোনও রকমে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাব।” তাঁর এই ফিরে আসা ছাত্রছাত্রীদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনই নিজের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে এক নতুন উদ্যম যোগ করল।