আইনে পরিণত হল ওয়াকফ বিল, মিললো রাষ্ট্রপতির সম্মতি, বিরোধীদের আপত্তি বহাল

দীর্ঘ বিতর্ক ও টানাপোড়েনের পর অবশেষে আইনে পরিণত হল ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু শনিবার এই বিলে তাঁর সম্মতি প্রদান করেছেন। এর আগে লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিলটি দীর্ঘ আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ হয়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি মুসলমান ওয়াকফ (রদ) বিল, ২০২৫-এও সম্মতি দিয়েছেন। কেন্দ্র সরকার সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি জারি করার পরই এই নতুন ওয়াকফ আইন কার্যকর হবে।

সরকারের তরফে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর এই আইনটি ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন, ২০২৫ নামে প্রকাশিত হল।’

এই নতুন আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হল দেশে ওয়াকফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের উন্নতি ঘটানো। এই সংশোধনী আনা হয়েছে ওয়াকফ অ্যাক্ট, ১৯৯৫-এর অধীনে। গত বছর অগাস্ট মাসে এই বিল প্রথমবার সংসদে পেশ করা হয়েছিল। তবে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়ার পর বিলটিকে একটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে (JPC) পাঠানো হয়।

বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পালের নেতৃত্বে গঠিত এই JPC দীর্ঘ আলোচনার পর চলতি বাজেট অধিবেশনে, অর্থাৎ ২ এপ্রিল পুনরায় বিলটি পেশ করে। এরপর ৩ এপ্রিল ভোররাতে লোকসভায় এই বিলটি পাশ হয়। ভোটাভুটিতে ২৮৮ জন সাংসদ বিলের পক্ষে এবং ২৩২ জন সাংসদ বিপক্ষে ভোট দেন। এর পর ৪ এপ্রিল সকালে রাজ্যসভায় বিলটি পাশ হয়, যেখানে ১২৮ জন সদস্য বিলের সমর্থনে এবং ৯৫ জন সদস্য বিপক্ষে ভোট দেন।

বিরোধীদের আপত্তি ও আইনি চ্যালেঞ্জ

বিরোধী দলগুলি এই নতুন আইনকে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে যে এই আইন কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনাই এর মূল লক্ষ্য।

নতুন আইনে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ওয়াকফ কাউন্সিলে সর্বাধিক চারজন অ-মুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তি, যার মধ্যে দুইজন মহিলা সদস্য বাধ্যতামূলক। এছাড়াও, কোনও সম্পত্তি ওয়াকফভুক্ত নাকি সরকারি, তা নির্ধারণের ক্ষমতা জেলা শাসকের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের প্রদান করা হয়েছে।

বিরোধী দল কংগ্রেস, এআইএমআইএম এবং আম আদমি পার্টি (আপ) এই আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করেছে। কংগ্রেস সাংসদ মোহাম্মদ জাভেদ, এআইএমআইএম সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এবং আপ বিধায়ক আমানতুল্লাহ খান তাঁদের পিটিশনে অভিযোগ করেছেন যে এই আইন মুসলিমদের মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।

এনডিএ শিবিরেও অসন্তোষ

এই বিতর্কিত বিলটি শাসক জোট এনডিএ-র অভ্যন্তরেও ফাটল ধরিয়েছে। বিহারে এই বছরের শেষেই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর পাঁচজন বর্ষীয়ান নেতা এই বিলের প্রতিবাদে দল ত্যাগ করেছেন।

এই বিতর্কিত আইনের রাজনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয় হল দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই বিষয়ে কী রায় দেয়। ওয়াকফ সম্পত্তির ভবিষ্যৎ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকারের উপর এই আইনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হবে।