OMG! চড়া সুদে ঋণের আড়ালে কিডনি বিক্রি চক্র, পাচার হয়ে যেত আফ্রিকাতেও

এ রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে শুধু প্রতিবেশী রাজ্য নয়, কিডনি বিক্রি চক্রের মাধ্যমে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রহীতাদের কাছেও কিডনি পৌঁছে যেত বলে তদন্তে জানতে পেরেছে অশোকনগর থানার পুলিশ। চড়া সুদে ঋণের আড়ালে এই ভয়াবহ কিডনি বিক্রি চক্রের একেবারে মূল থেকে এর সাপ্লাই লাইন নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর তদন্তকারীরা।

একদিকে যেমন সুদখোর ব্যবসায়ী বিকাশ ঘোষ এবং মূল পান্ডা গণপতি জানা ওরফে অমিতের মতো মধ্যস্থতাকারীদের দফায় দফায় জেরা করছে পুলিশ, তেমনই বিদেশ এবং এ রাজ্যের কিডনি গ্রহীতারাও রয়েছেন তদন্তকারীদের কঠোর নজরদারিতে। এই সাপ্লাই লাইনের উৎস বন্ধ করার জন্য সোমবার বারাসত পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্পর্শ নীলাঙ্গি ধৃতদের দীর্ঘক্ষণ জেরা করেন।

ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কিডনি বিক্রির সাপ্লাই লাইনের কয়েকজন এজেন্টের কার্যকলাপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে অশোকনগর থানার পুলিশ। পুলিশের ধারণা, এই সাপ্লাই লাইনের চার-পাঁচজন এজেন্ট সুদখোর ব্যবসায়ীদের হয়ে একেবারে তৃণমূল স্তরে কাজ করত। তাদের প্রধান কাজ ছিল এমন অসহায় মানুষদের খুঁজে বের করা, যারা চড়া সুদ হলেও ঋণ নিতে রাজি হবে।

পরবর্তীতে এই এজেন্টরাই ওই অসহায় মানুষগুলোকে সুদখোর ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে আসত। ঋণ দেওয়ার পর, এই এজেন্টরাই ব্যবসায়ীদের হয়ে প্রতিদিন সুদের টাকা সংগ্রহ করত এবং সংগৃহীত অর্থের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে কমিশন পেত।

তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, যে ঋণগ্রহীতারা পরপর কয়েকদিন সুদের টাকা দিতে পারত না, সুদখোর ব্যবসায়ীরা কালেকশন এজেন্টদের সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়িতে চড়াও হতো। প্রথম দিকে তাদের হুমকি দেওয়া হতো, এবং পরবর্তীকালে ঋণগ্রহীতাদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হতো। এরপরেও যদি কেউ সুদের টাকা পরিশোধ করতে পারত না, তখনই অসহায় ঋণগ্রহীতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো। কিডনি বিক্রি সম্পন্ন হলে, এক একজন সুদখোর ব্যবসায়ী কমপক্ষে ২০ লক্ষ টাকা লাভ করত বলে জানতে পেরেছে পুলিশ।

আন্তর্জাতিক ব্ল্যাক মার্কেটের তুলনায় কলকাতা-সহ সংলগ্ন এলাকায় কিডনির দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, আইনের ফাঁক গলে সহজেই কিডনি পাওয়া যেত। এই কারণে মূলত আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলো থেকে গ্রহীতারা এ রাজ্যের কিডনি বিক্রি চক্রের দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। তদন্তে ঘানা, কঙ্গো, কম্বোডিয়া-সহ প্রতিবেশী বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের কয়েকজন গ্রহীতার নামও জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। এছাড়াও, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা-সহ একাধিক রাজ্যের গ্রহীতাদের নাম উঠে এসেছে।

পুলিশের তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, প্রতিটি জেলায় কিডনি পাচারের জন্য আলাদা আলাদা দল কাজ করলেও, তারা দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালের সূত্রে একই সুতোয় বাঁধা ছিল। পাশাপাশি, অশোকনগর থানা এলাকায় একাধিক সুদখোরের চাপে গত ৫-৭ বছরে কমবেশি ২৫ জন কিডনি বিক্রি করেছেন। এছাড়াও, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকা থেকেও বহু মানুষ সুদখোর ব্যবসায়ীদের চাপে কিডনি দান করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। আপাতত এই সাপ্লাই লাইন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করাই তদন্তকারী পুলিশ কর্তাদের প্রধান লক্ষ্য।

বারাসতের পুলিশ সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খড়িয়া জনসাধারণের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, “সহজে ঋণ পাওয়ার লোভে কেউ যেন চড়া সুদের কারবারিদের পাতা ফাঁদে পা না দেন। যদি কেউ চড়া সুদ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে অবিলম্বে পুলিশকে জানান।”