“পার্টি অফিস গুলোতে যে শতশত চামচাদের নিয়ে বসে থাকেন..”-অক্সফোর্ডে মুখ্যমন্ত্রীর হেনস্থা, ক্ষোভ দেবাংশুর

অক্সফোর্ডের কেলগ কলেজে ভাষণ দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হওয়া নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে জোর চর্চা চলছে। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে প্রশ্ন এবং এসএফআই (ইউকে) সমর্থকদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগানের মুখে পড়তে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। এমনকি বাম ছাত্রদের বিক্ষোভের মধ্যে মমতাকে তাঁর পুরনো আহত হওয়ার ছবিও তুলে ধরতে দেখা যায়। এই ঘটনায় বিজেপিও মুখ্যমন্ত্রীর লন্ডন সফর নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের একাংশের নীরবতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন দলের আইটি সেলের প্রধান দেবাংশু ভট্টাচার্য। ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দলের সেই সমস্ত নেতা-নেত্রীদের তুলোধোনা করেন, যাঁরা অক্সফোর্ডের ঘটনায় কোনো নিন্দা বা প্রতিবাদ জানাননি। দেবাংশু লেখেন, “আপনারা কেন যুদ্ধের সময় চুপ থাকেন? আপনারা কেন লড়াইয়ের সময় পড়ে পড়ে ঘুমোন? অসময়ে কোথায় হারিয়ে যান?”
অতীতে দেখা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো অপমানের বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় তৃণমূল নেতৃত্ব সরব হয়েছে। কিন্তু এবারের লন্ডন সফরে যা ঘটেছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাই কার্যত নীরব থেকেছেন। এখানেই ক্ষোভ উগরে দেন দেবাংশু।
জনপ্রতিনিধি এবং পদাধিকারীদের কাছে দেবাংশুর কাতর অনুরোধ, “দয়া করে নেত্রীর অসম্মানের সময় অন্তত মুখ খুলুন। এই নেত্রী এবং দলের অনুমোদনই আপনি, আমি আজ কেউ নির্বাচিত সদস্য, কেউ বা বড় পদের অধিকারী। এই নেত্রীর জন্যেই আজ আমাকে, আপনাকে লোক চিনেছে, জিতিয়েছে। দল আপনাকে কঠিন সময়ে দেখেছে, এগিয়ে দিয়েছে। আপনারা কেন যুদ্ধের সময় চুপ থাকেন? আপনারা কেন লড়াইয়ের সময় পড়ে পড়ে ঘুমোন? অসময়ে কোথায় হারিয়ে যান? এলাকায় একটা মিছিল বার করেন না কেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট করেন না কেন? অনুষ্ঠানের সময় তো মঞ্চে ইয়া বড় বড় ফুলের বুকে আর লম্বা লম্বা উত্তরীয় গলায় ঝোলাতে দুবার ভাবেন না! পদের দাবি জানানোর সময় তো গলার জোরে গগন ভেদ করার জোগাড় হয়.. কিন্তু যুদ্ধের সময়? মৌনব্রত? সব ইস্যুতে দল কিংবা মন্ত্রীরা বলে দেবে, তারপর নামতে হবে? প্রতিবার উপর থেকে আসা কর্মসূচির অপেক্ষা করতে হবে? নেত্রীকে অসম্মান করলে গায়ে জ্বালা ধরে না? তখনও নির্দেশ আসার অপেক্ষা করতে হয়? নিজে থেকে একটা মিছিল কিংবা একটা পথসভা করলে কি দল আপনাকে তাড়িয়ে দেবে? পার্টি অফিস গুলোতে যে শতশত চামচাদের নিয়ে বসে থাকেন, যাদেরকে দিয়ে শুধুমাত্র নিজের সঙ্গে সেলফি কিংবা আপনার ড্রেন উদ্বোধনের ছবি পোষ্ট করান, এসব ইস্যুতে তাদের দিয়ে একটা করে ফেসবুক, টুইটারে পোষ্ট তো করাতে পারেন অন্তত! পারেন না?”
এরপর নিজের প্রসঙ্গে দেবাংশু আরও লেখেন, “আমরা কজনই লড়ব শুধু? আমরা কজনই মুখ খুলব প্রতিবার? আমরাই গালাগাল খাব? আমাদেরও তো পরিবার আছে, বাড়িতে বুড়ো মা, বাবা আছে। আমরাও তো গা বাঁচিয়ে চলতে পারি! কই, পালিয়ে যাই না তো! আপনারা পালান কেন? সিনিয়র মন্ত্রীরা হাজার একটা কাজের মাঝে ব্যস্ত থাকেন। তারা তাদের সুযোগ সুবিধা মত বলেন বা করেন মাঝে মাঝে। কিন্তু আপনারা? গা বাঁচিয়েই যদি চলবেন তবে পঞ্চায়েতে, পৌরসভার, বিধানসভায়, লোকসভায় দাঁড়িয়েছিলেন কেন? আমায় অনেক ভরসা করে নেত্রী আর অভিষেকদা এই জায়গা দিয়েছেন। প্রথমে কনিষ্ঠতম মুখপাত্র, তারপর রাজ্যের কনিষ্ঠতম যুবর সাধারণ সম্পাদক, তারপর আইটি ইনচার্জ এবং ফাইনালি কনিষ্ঠতম লোকসভার প্রার্থী। এই মানুষগুলো আমায় রাস্তার ধার থেকে কুড়িয়ে তুলে এনে ফুলদানিতে জায়গা দিয়েছেন। যুদ্ধের সময় নীরব থাকা কিংবা গা বাঁচিয়ে চলা আমার কাছে তাদের ভরসার সাথে বেইমানি করার সামিল। আমি পারি না।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবাংশুর এই বিস্ফোরক পোস্ট ইতিমধ্যেই দলের অন্দরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দলের প্রথম সারির নেতৃত্বের নীরবতা এবং কর্মীদের একাংশের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবাংশু কার্যত দলের ভেতরের চিত্রটি প্রকাশ্যে আনলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁর এই মন্তব্য দলের অভ্যন্তরে আত্মসমীক্ষার সূত্রপাত ঘটাতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।