পাকিস্তানে নির্বাচন: কোন পথে হাঁটছে ইমরানের পিটিআই?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে এগিয়ে আছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
গত বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শেষে তিন দিন পর রোববার পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন ইসিপি। ২৬৪ আসনের মধ্যে ১০১টি আসন পেয়েছেন তারা। এদের মধ্যে বেশিরভাগই দেশটির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান সমর্থিত। নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন পেয়েছে ৭৫টি আসন। আর বিলাওয়াল ভূট্টোর পিপিপি পেয়েছে ৫৪টি আসন। এছাড়াও এমকিউএম দল পেয়েছে ১৭টি। আর বাকি ১৭টি আসন পেয়েছে অন্যরা।

এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে কোনো রাজনৈতিক দলকে দেশটির জাতীয় পরিষদের ২৬৬টি আসনের মধ্যে ১৩৪টি আসনে জয়ী হতে হবে। পাকিস্তানে ৮ ফেব্রুয়ারির ভোটে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এ অবস্থায় সরকার গঠনের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে ২৬৬টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের একটি আসনে ভোট বাতিল করা হয়েছে এবং পাঞ্জাবের অন্য একটি আসনের ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। এ কারণে ফল ঘোষণা করা হয়েছে ২৬৪টি আসনের।

দ্য ডন ও জিও টিভির খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ৮৮, ১৮ এবং ৯০ আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে পুনরায় নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। ১৫ ফেব্রুয়ারি এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

আল জাজিরা বলেছে, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মোট আসনসংখ্যা ৩৩৬। এর মধ্যে ২৬৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। এছাড়া বাকি ৭০টি আসন সংরক্ষিত। এসব আসনের মধ্যে ৬০টি নারীদের ও ১০টি সংখ্যালঘুদের।

নির্বাচনের ফল প্রকাশে বিলম্বের প্রতিবাদ এবং ফল ঘোষণায় স্বচ্ছতার দাবিতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ।
নির্বাচনের ফল প্রকাশে বিলম্বের প্রতিবাদ এবং ফল ঘোষণায় স্বচ্ছতার দাবিতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ।

এদিকে পাকিস্তানে এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব নয় জেনে রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ সরকার গঠনের জন্য আলোচনা শুরু করেছে। শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির মধ্যে বৈঠক নিয়ে নানা আলোচনা শোনা যায়। তবে পিপিপি নওয়াজের কাছে দাবি জানিয়েছে, মুসলিম লীগকে পিপিপির সমর্থন পেতে হলে বিলাওয়াল ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাতে হবে। তবে এতে নওয়াজের ভাষ্য না পাওয়া গেলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই দাবি মেনে মুসলিম লীগ পিপলস পার্টির সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করছে না। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, পিটিআই কোন পথে হাঁটছে-

পাকিস্তানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কি সরাসরি সরকার গঠন করতে পারবে?

সংবাদমাধ্যম ডনের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সরাসরি সরকার গঠন করতে পারে না। এজন্য বিজয়ী হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো দলের সঙ্গে জোট করতে হবে তাদের। তাই পাকিস্তানে পরবর্তী সরকার গঠন কারা করছে- সেই সমীকরণ এখনো পরিষ্কার নয়। যদিও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রধান ব্যারিস্টার গওহর দাবি করেছেন তারাই পাকিস্তানে পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ইমরান খান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছেন।
পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ইমরান খান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছেন।

কোন পদ্ধতিতে পরবর্তী সরকার গঠন হতে পারে

পাকিস্তানে এখন কীভাবে পরবর্তী সরকার গঠিত হতে পারে- তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। দেশটির গবেষক জাইঘাম খান জানিয়েছেন, পিটিআইকে বাদ দিয়ে অন্যরা সরকার গঠন করলে বেশিরভাগ পাকিস্তানি তাকে বৈধ মনে করবেন না। তাতে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গবেষক জাইঘাম বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দুটি সম্ভাব্য উপায়ে দেশটিতে সরকার গঠিত হতে পারে। সরকার গঠনের প্রথম উপায়টি হলো- পিটিআইকে বাদ দিয়ে দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি, নওয়াজের মুসলিম লীগ, এমকিউএম, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্যরা জোট গঠন করতে পারে।

এই বিশ্লেষক বলেন, দ্বিতীয় উপায়টি হলো- পিপিপি ও পিটিআইয়ের জোট সরকার। তবে এর সম্ভাবনা কম। যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পিপিপিকে সমর্থন দেন তবে এটি সম্ভব। জাইঘাম আরো বলেন, এই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। তাই যারা সরকার গঠন করুক না কেন, জনগণ তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে না।

পাকিস্তানের করাচিতে একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের প্রতীক সংবলিত পোস্টার দেখছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের করাচিতে একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের প্রতীক সংবলিত পোস্টার দেখছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স

এদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, জোট গঠনের ব্যাপারে পিপিপির সঙ্গে পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

স্বতন্ত্রদের সমর্থন নিতে পারবে পিএমএল-এন?

সাংবাদিক জারার খুহরো বলেন, অনেকেই পিএমএল-এনের সঙ্গে জোট গড়তে আগ্রহী। সব স্বতন্ত্র প্রার্থী কী করবেন, তা নিয়ে ঢালাওভাবে কথা বলতে দ্বিধা হচ্ছে আমার।

তিনি বলেন, তবে এটি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হবে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআই ছেড়ে যাওয়া নেতাদের গ্রহণ করবে না জনগণ। দক্ষিণ পাঞ্জাবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। সেখানে পিএমএল-এন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীকে দলে ভেড়াতে পারে। সাময়িক হয়রানির শিকার হওয়া লাগতে পারে, এমন সমীকরণ মাথায় নিয়ে অনেকে বিজয়ীদের দলে যোগ না-ও দিতে পারেন।

সূত্র : দ্য ডন