কালীঘাটে কালীপুজোয় মা কালী নন, পুজো হয় মহালক্ষ্মীর? শতবর্ষের প্রাচীন এই গোপন আচারের আসল সত্য জানলে চমকে যাবেন!

কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত কালীঘাট (Kalighat)। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মহানগরের চেহারা ও মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে গেলেও, কালীঘাটের মায়ের প্রতি ভক্তদের টান এবং ভক্তির গভীরতা আজও এক বিন্দুও ম্লান হয়নি। কারও কাছে তিনি পরম জাগ্রত দেবী, কারও কাছে বিপদের দিনে শেষ আশ্রয়, আবার কারও কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাসের ঠিকানা। সেই ঐতিহাসিক পীঠস্থান কালীঘাটেই কালীপুজোর দিন পালিত হয় এক অত্যন্ত বিশেষ ও অনন্য পরম্পরা। যে আচারের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে দেবীর যুগপৎ দুই রূপের আরাধনা, অশুভ শক্তিকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তির আগমন বার্তা এবং শত শত বছর ধরে বয়ে চলা নানা মন ভোলানো নিয়ম।
সন্ধ্যায় মহালক্ষ্মী আরাধনা, রাতে মায়ের নিশিপুজো
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, কালীপুজো মানেই বুঝি কেবল মা কালীর প্রতিমা, অমাবস্যার ঘন অন্ধকার রাত, প্রদীপের রোশনাই আর গভীর রাতে নিশিপুজোর আয়োজন। কিন্তু কালীঘাটের কালীপুজোর সন্ধ্যার চিত্রটা একেবারে আলাদা। এখানে কালীপুজোর দিন সন্ধ্যায় মা কালীর পুজো হয় একেবারে মহালক্ষ্মী রূপে। মন্দিরের সেবায়েতদের বিশ্বাস, এই বিশেষ আচারের মাধ্যমেই অলক্ষ্মীকে পাকাপাকিভাবে বিদায় জানিয়ে অন্দরে আহ্বান করা হয় দেবী মহালক্ষ্মীকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কালীঘাটে মায়ের কালীরূপের পুজো হয় না। বরং রাত গভীর হতেই অমাবস্যার সেই নিশিতে ফের মা কালীর রূপেই মহাসমারোহে আরাধনা করা হয় দেবীকে। অর্থাৎ, একই পবিত্র দিনে দেবীর দুই ভিন্ন রূপের পুজো দেখার এই দুর্লভ পরম্পরা কেবল কালীঘাটেই সম্ভব।
৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম ও পৌরাণিক ইতিহাস
কালীঘাট মন্দিরের ইতিহাস শুধুমাত্র একটি সাধারণ ইঁট-পাথরের স্থাপত্যের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণশাস্ত্র, লোকবিশ্বাস এবং কলকাতার প্রাচীন জনপদের স্মৃতি। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি দেশের বিখ্যাত ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর দেহত্যাগের পর শোকে মত্ত মহাদেব যখন সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয় তাণ্ডব শুরু করেছিলেন, তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচাতে ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করেন। সেই দেহের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। বিশ্বাস করা হয়, দেবীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল এই কালীঘাটেই। সেই থেকেই এই স্থান মহাশক্তিপীঠ হিসেবে বিশেষ মাহাত্ম্য অর্জন করেছে।
একসময় বর্তমানের আধুনিক কলকাতা এমন জনবহুল ছিল না। কালীঘাটের চারপাশ জুড়ে ছিল গভীর জঙ্গল, আর পাশ দিয়ে বয়ে যেত ভাগীরথীর প্রাচীন গতিপথ আদিগঙ্গা। জনশ্রুতি রয়েছে, বহু শতাব্দী আগে এক সাধক নদীর তীরে একটি পাথরের মধ্যে অবিকল সতীর পায়ের আঙুলের আকৃতি দেখতে পান। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দেবীর পুজো। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতকে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮০৯ সালে বর্তমান কালীঘাট মন্দির নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়।
কেন পালিত হয় বিশেষ মহালক্ষ্মী পুজো?
কালীঘাট মন্দিরের কাউন্সিল অফ সেবায়েতের এগজিকিউটিভ মেম্বার সন্দীপ হালদার জানান, সারা বছর ধরে মানবজীবন, সমাজ এবং মন্দিরের অন্দরে নানা নেতিবাচক দিক ও সমস্যা তৈরি হয়। সেই সমস্ত অশুভ শক্তি ও অন্ধকার দূর করে নতুন আলোর দিশা পেতেই অলক্ষ্মীকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে মহালক্ষ্মীকে আহ্বান করা হয়।
এই রীতি পালনের জন্য বিশেষ কিছু আচার রয়েছে:
-
প্যাাকাটি নিয়ে প্রদক্ষিণ: সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ পুজো শুরুর আগে সেবায়েত কুল প্যাকাটি হাতে নিয়ে তিনবার মন্দির প্রদক্ষিণ করেন। এর মাধ্যমেই মূলত অলক্ষ্মী বিদায়ের প্রাচীন আচার সম্পন্ন হয়।
-
বিশেষ সাজ ও নৈবেদ্য: এরপর নাড়ু, মণ্ডা-মিঠাই, হরেক রকমের মিষ্টি, ফুল, শাড়ি, সুগন্ধি তেল এবং পারফিউম দিয়ে দেবীকে মহালক্ষ্মী রূপে সাজানো হয়। সেবায়েতদের বাড়ি থেকে আসা নৈবেদ্য দিয়েই এই পুজো সম্পন্ন হয়। গর্ভগৃহে পুজো চলাকালীন কিছু সময়ের জন্য মন্দির দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
-
বিশেষ ভোগ: এদিনের ভোগে খিচুড়ির পাশাপাশি নিবেদন করা হয় পাঁচ রকমের ভাজা, পাঁচ রকমের মাছ, আমিষ ভোগ হিসেবে বলির মাংস (যেখানে কোনো পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার হয় না), সবজি, পায়েস, চাটনি ও মিষ্টি। ভোগ নিবেদন ও আরতির পর ফের মন্দির খুলে দেওয়া হয় ভক্তদের জন্য।
রাতের নিশিপুজো ও হরেন ময়রার বিখ্যাত ক্ষীরমোহন
সন্ধ্যায় মহালক্ষ্মী পুজোর পর্ব শেষ হলেও কালীঘাটের উৎসবের রাত এখানেই শেষ হয় না। অমাবস্যার নিশিতে যথারীতি কালীরূপে দেবীর বিশেষ নিশিপুজো অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ ভক্তরা যাতে বেশি সময় ধরে মায়ের পুজো ও দর্শন করতে পারেন, সেই কথা মাথায় রেখে এদিনের নিশিপুজো ও ভোগ নিবেদনের সময়সূচিতেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মায়ের শয়ন প্রক্রিয়াতেও রয়েছে এক আকর্ষণীয় পরম্পরা। সারা দিনের ধকলের পর রাতে যখন মাকে শয়ন করানোর প্রস্তুতি চলে, তখন তেল দিয়ে মাকে পরিষ্কার করে সিঁদুর লাগিয়ে শাড়ি ও মালায় সাজানো হয়। আর মায়ের ভোগ বা নিবেদনের তালিকায় বহুদিন ধরেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হরেন ময়রার বিখ্যাত চ্যাপ্টা রসগোল্লা, যা স্থানীয়ভাবে ‘ক্ষীরমোহন’ নামে পরিচিত। মন্দিরের অদূরে থাকা এই পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দোকানের এই বিশেষ মিষ্টি প্রতিদিন নিয়ম করে মায়ের সেবায় নিবেদন করা হয়।
কালীপুজোর দিন মন্দিরের নির্দিষ্ট সময়সূচি
-
ভোর ৩:০০ টা: মন্দির খোলার প্রস্তুতি, মঙ্গল আরতি ও নিত্যপুজো।
-
ভোর ৪:০০ টা: সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের দরজা উন্মুক্ত করা হবে।
-
দুপুরবেলা: মায়ের মধ্যাহ্ন ভোগ নিবেদনের সময় কিছুক্ষণের জন্য মন্দির বন্ধ রাখা হবে। এদিনের দুপুরের বিশেষ ভোগে থাকছে পোলাও, সাদা ভাত, পাঁচ রকমের আঁশযুক্ত মাছ, পাঁচ রকমের ভাজা, বলির মাংস, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি ও পান।
-
সন্ধ্যা ও রাত্রি: সন্ধ্যা নামতেই মহালক্ষ্মী পুজো এবং গভীর রাতে মূল নিশিপুজো অনুষ্ঠিত হবে।
-
রাত ২:১৫ – ২:৩০ মিনিট: গর্ভগৃহ থেকে দর্শনার্থীদের বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
-
রাত ৩:০০ টা: মায়ের শয়ন সম্পন্ন হওয়ার পর মন্দিরের মূল গেট বন্ধ করা হবে।