“মোদী কোথাও যাবেন না!” রাহুলের চ্যালেঞ্জের জবাবে বিজেপির নয়া অস্ত্র, স্লোগানের রাজনীতিতে তুফান!

রবিবার দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলার ময়দানের সমাবেশ থেকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশনের জ্ঞানেশ কুমার তো বটেই, ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও। ঠিক তার পরেই চণ্ডীগড়ের এক জনসভা থেকে এই চ্যালেঞ্জের তীব্র জবাব দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “মোদী কোথাও যাবেন না!”
আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই একটিমাত্র বাক্যই এখন ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পাল্টা মন্তব্য নয়, বরং বিজেপির নতুন রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে, যা নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দেশের রাজনৈতিক অলিন্দে।
কোত্থেকে এল এই নয়া স্লোগান? খাড়্গেসের মন্তব্যে তোলপাড়
বিজেপির এই নবতম স্লোগানের সূত্রপাত হয়েছিল গত সপ্তাহেই। দিল্লির সমাবেশকে সফল করতে পাটনায় একটি মেগা জনসভা করেছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে। সেই সভায় রাজনৈতিক আক্রমণের সুর চড়িয়ে তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেন, “শুধু মোদী কেন, তাঁর পিতাকেও ক্ষমতা থেকে সরতে হবে!”
খাড়্গের সেই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশজুড়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলে বিজেপি। আর সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় এই নতুন স্লোগান— “মোদী কোথাও যাবেন না!” গত শনিবার গুজরাট সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের ১৫১তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দেন, তখন বিমানবন্দর থেকে শুরু করে প্রতিটি দলীয় কর্মসূচিতে হাজার হাজার কর্মীর হাতে এই স্লোগান লেখা পোস্টার দেখা যায়। সোমবার সকালে এই পোস্টার নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে রাজনৈতিক পারদ আরও চড়িয়ে দেন প্রবীণ বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি।
বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টকে হাতিয়ার করে আসরে নামছে গেরুয়া শিবির
বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণের জবাবে বসে নেই পদ্মশিবির। রাজনৈতিক মহলের খবর, প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প যে এ দেশে কেউ নেই, এই বার্তা এবার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চলেছে বিজেপি। বিরোধী ঐক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গেরুয়া শিবিরের নতুন অস্ত্র হতে চলেছে বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত এক দশকে ভারতে দারিদ্র উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং অতি দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে, মোদী জমানার জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে সামনে রেখেই এবার প্রচারে শান দিতে প্রস্তুত বিজেপি।
‘স্লোগান-ই রাজনীতি’: ২০১৪ থেকে ২০২৬, এক নজরে মোদী জমানার মেগা স্লোগানের ইতিহাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নরেন্দ্র মোদীর সাড়ে ১২ বছরের শাসনে বিজেপি এবং তাঁর সরকার যেভাবে নিখুঁত ও সময়োপযোগী স্লোগান তৈরি করেছে, তাতে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বা অন্য কোনো দল ধারেকাছেও নেই। একনজরে দেখে নেওয়া যাক মোদী জমানার সেই সমস্ত জনপ্রিয় স্লোগান, যা ভারতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছিল:
২০১৪ লোকসভা নির্বাচন: ‘অচ্ছে দিন আনে ওয়ালে হ্যায়’, ‘আব কি বার, মোদী সরকার’ এবং ‘হর হর মোদী, ঘর ঘর মোদী’।
২০১৭-র চৌকিদার প্রচার: নিজে দেশের পাহারাদার ঘোষণা করে মোদী আনেন ‘ম্যায় ভি চৌকিদার’ স্লোগান, যার জবাবে কংগ্রেসের ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ কটাক্ষও বেশ আলোড়ন তোলে।
২০১৯ লোকসভা নির্বাচন: ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, ‘ফির এক বার, মোদী সরকার’ এবং ‘আব কি বার তিনশো পার’ (লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে বিজেপি জিতেছিল ৩০৩ আসন)।
২০২৪ লোকসভা নির্বাচন: ‘আব কী বার ৪০০ পার, তিসরি বার মোদী সরকার’ এবং গ্যারান্টির রাজনীতিতে ‘মোদী কি গ্যারান্টি’ ও ‘মোদী কা পরিবার’।
সাম্প্রতিক মাইলফলক: মোদীর প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর পূর্তিতে নতুন স্লোগান— ‘হাম করকে দিখায়েঙ্গে’, যা ২০৪৭ সালের মধ্যে নতুন ভারত গড়ার অঙ্গীকারকে সামনে রেখে তৈরি।
বিরোধীরা যতই একে ‘স্লোগানের রাজনীতি’ বা ঔদ্ধত্য বলে আক্রমণ শানাক না কেন, রাজনৈতিক পণ্ডিতরা মনে করেন, নিখুঁত সময়ে সঠিক স্লোগানই একটি রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার অন্যতম জ্বালানি। আর সেই খেলায় পদ্মশিবির যে বরাবরই এক ধাপ এগিয়ে, তা বারে বারে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।