‘চাকরি তো পাচ্ছি, কিন্তু বাবার খুনিদের বিচার কই?’ নবান্নের ঐতিহাসিক ঘোষণায় আবেগঘন স্বজনহারারা!

রাজনৈতিক হিংসায় প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা, দীর্ঘদিনের চরম আর্থিক অনটন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা—এই তিনের সঙ্গেই গত কয়েক বছর ধরে লড়াই করে চলেছে বাংলার অসংখ্য পরিবার। অবশেষে সেই স্বজনহারা পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবান্ন।

গত ২৫ বছরে রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নির্বাচনী হিংসায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতর থেকে ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে এবং মন্ত্রিসভায় মিলেছে আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন।

এই ঘোষণায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ রাজ্যের একাধিক স্বজনহারা পরিবারে যেমন আশার আলো দেখা দিয়েছে, তেমনই তাঁদের একই সুরে দাবি—“চাকরির পাশাপাশি খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই!”

‘বাবাকে হারিয়েছি, চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কুর্নিশ, কিন্তু শাস্তি চাই খুনিদের’

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন ডায়মন্ডহারবার মহাবিদ্যালয়ের গণনাকেন্দ্র থেকে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়েছিলেন মগরাহাট পশ্চিম কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী মানস সাহা। গুরুতর জখম অবস্থায় দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২২ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তাঁর।

পাঁচ বছর পর নবান্নের এই সিদ্ধান্ত শুনে মানস সাহার কন্যা ঋত্বিকা সাহা আবেগে ভেসে বলেন:

“আমরা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। বাবার মৃত্যুর পর তীব্র অভাব-অনটনের মধ্যে আমাদের দিন কেটেছে। রাজ্য সরকারকে কুর্নিশ জানাই। কিন্তু শুধু চাকরি দিলেই তো হবে না! আমার বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা জড়িত, তাদেরও গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”

‘ভাইকে হারিয়ে অসহায় পরিবার, চাকরির ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি’

একইভাবে ডায়মন্ডহারবারের খোর্দনলা গ্রামের বিজেপির বুথ সভাপতি রাজু সামন্তকে ২০২১ সালে ফল ঘোষণার পর দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করা হয় এবং পরে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল। একমাত্র রোজগেরে সদস্যকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল তাঁর পরিবার।

রাজুর দিদি কণিকা বাগ কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান:

“আমার ভাই অত্যন্ত ভালো ছেলে ছিল। শুধু একটা রাজনৈতিক দল করার অপরাধে তাকে প্রাণ দিতে হলো। ভাই চলে যাওয়ার পর মা এখন আমার কাছেই থাকেন। আমরা খুবই অসহায়। সরকারের এই চাকরির সুযোগ যদি আমাদের পরিবারের কেউ পায়, তবে অন্তত দু’বেলা খেয়েপরে বাঁচার কিছুটা স্বস্তি মিলবে।”

‘চোখের সামনে স্ত্রীকে মারা হতে দেখেছি, ন্যায়বিচার চাই’

সাতগাছিয়ার দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামের বিজেপি কর্মী চন্দনা হালদারও ২০২১-এর হিংসার বলি হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী গৌতম হালদার স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ফল ঘোষণার পর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁর স্ত্রীকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

গৌতমবাবু বলেন, “নিজের চোখের সামনে স্ত্রীকে এভাবে খুন হতে দেখেছি। সেই দগ্ধ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। সরকারের এই চাকরির ঘোষণায় আমরা সত্যিই খুব খুশি, কিন্তু অভিযুক্তদের যেন কঠোর শাস্তি হয়।”

অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি এবার নজর ন্যায়বিচারের দিকে

নবান্নের এই সিদ্ধান্ত স্বজনহারা পরিবারগুলির জন্য নিঃসন্দেহে এক নতুন আশা ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনটন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নবান্নের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসিত হলেও, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য স্পষ্ট—আর্থিক মলম দিয়ে স্বজন হারানোর ক্ষত পুরোপুরি মোছা সম্ভব নয়। তাই চাকরির পাশাপাশি এবার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলাগুলিতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁরা।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *