১৯৫৩ সালের পর প্রথমবার! উমরের ক্যাবিনেটে জম্মুর ৮টি জেলা একঝটকায় ছাঁটাই, তীব্র ক্ষোভে উত্তাল উপত্যকা

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে অভূতপূর্ব এবং অত্যন্ত বিতর্কিত মোড়! মুখ্যমন্ত্রী উমর আবদুল্লার নতুন মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে জম্মু অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন রদবদলের ফলে জম্মু জেলা থেকে একজন বিধায়কেরও ঠাঁই হয়নি সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রধান বোর্ডে। এমনকি ৯ সদস্যের উমর মন্ত্রিসভায় গোটা জম্মু বিভাগ থেকে হিন্দু প্রতিনিধি হিসেবে রয়ে গিয়েছেন মাত্র একজন।

৭০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম: জম্মু শহর ও ৮টি জেলা সম্পূর্ণ বাদ

১৯৫৩ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের শাসনব্যবস্থায় জম্মু ও শ্রীনগরকে সর্বদা সমমানের আঞ্চলিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও এবার সেই ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। জম্মু বিভাগের ১০টি জেলার মধ্যে ৮টি জেলা— জম্মু, সাম্বা, কাঠুয়া, উধমপুর, রামবন, ডোডা, কিস্তোয়ার এবং রিয়াসি থেকে কোনো বিধায়ককেই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে কাশ্মীর উপত্যকা থেকে ৭ জন মন্ত্রী থাকলেও জম্মু বিভাগ থেকে মন্ত্রী রয়েছেন মাত্র ২ জন (যাঁরা দুজনেই পীর পাঞ্জাল অঞ্চলের রাজৌরি ও পুঞ্চের প্রতিনিধি)। অর্থাৎ জম্মু বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ ভৌগোলিক অঞ্চল এখন পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বহীন!

যে জম্মু জেলায় সর্বাধিক ১১টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে এবং যেখান থেকে অতীতে সবসময় ৩-৪ জন মন্ত্রী থাকতেন, সেখানে ইতিহাস বদলে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে ডোগরা অধ্যুষিত অঞ্চলকে। সতীশ শর্মাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে এখন একমাত্র হিন্দু প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে রইলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী সুরিন্দর চৌধুরী।

যেসব বিকল্প হাতছাড়া করলেন উমর: এক নজরে

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আঞ্চলিক ও ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষা করার একাধিক যোগ্য ও প্রবীণ বিকল্প উমরের হাতে থাকা সত্ত্বেও তিনি তা ব্যবহার করেননি:

  • অর্জুন সিং রাজু (রামবন): রামবন কেন্দ্র থেকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের (NC) নিজস্ব অনুগত বিধায়ক। কঠিন আসনে জয়ী অর্জুনকে নেওয়া হলে চেনাব উপত্যকা (রামবন, ডোডা, কিস্তোয়ার) এবং হিন্দু প্রতিনিধি— দুই সমীকরণই পূরণ হতো।

  • পেয়ারে লাল শর্মা (ইন্দারওয়াল, কিস্তোয়ার): এনসি সমর্থিত প্রবীণ নির্দল বিধায়ক, যিনি কিস্তোয়ার ও সমগ্র চেনাব উপত্যকার প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন।

  • রামেশ্বর সিং (বানি, কাঠুয়া): কাঠুয়া জেলার বানি থেকে নির্বাচিত পাহাড়ি অঞ্চলের হিন্দু প্রতিনিধি, যেখানে ৬টি আসন থাকা সত্ত্বেও কোনো মন্ত্রী মেলেনি।

ইতিহাস কী বলছে? (১৯৫৩ – ২০২৪)

সময়কাল জম্মুর তৎকালীন প্রতিনিধিত্বের চিত্র
১৯৫৩-১৯৭৫ (বক্সী, সাদিক, কাসিম যুগ) চৌধুরী রাম পিয়ারা, ত্রিলোচন দত্ত ও বলরাজ পুরীর মতো হেভিওয়েট প্রতিনিধি।
১৯৭৫-১৯৮২ (শেখ আবদুল্লাহ) মঙ্গত রাম শর্মা, রঙ্গিল সিং এবং ধরম পাল মন্ত্রী ছিলেন।
১৯৮২-২০০২ (ফারুক আবদুল্লাহ) মঙ্গত রাম শর্মা (উপ-মুখ্যমন্ত্রী), রমেশ শর্মা, ধরম পালসহ প্রতিবার ৩-৪ জন মন্ত্রী।
২০০৯-২০১৪ (উমর + কংগ্রেস) শাম লাল শর্মা, রমণ ভাল্লা, তারা চাঁদ এবং অজয় সদহোত্রা— সর্বাধিক প্রতিনিধিত্ব।
২০১৫-২০১৮ (পিডিপি-বিজেপি) কবিন্দর গুপ্ত (উপ-মুখ্যমন্ত্রী), বলি ভগত, প্রিয়া শেঠি ও শাম চৌধুরী।
২০২৪ (উমরের নয়া মন্ত্রিসভা) জম্মু জেলা থেকে ০ জন মন্ত্রী। হিন্দু প্রতিনিধি মাত্র ১ জন।

উত্তপ্ত রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

উমর সরকারের এই পদক্ষেপে সরব হয়েছে বিজেপি। বিরোধী দলনেতা সুনীল শর্মা কটাক্ষ করে বলেন, “এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে ন্যাশনাল কনফারেন্স মূলত একটি কাশ্মীর-কেন্দ্রিক দল, জম্মুর ডোগরাদের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা আস্থা নেই।”

অন্য দিকে, এনসি-র অন্দরেও তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ। উপ-মুখ্যমন্ত্রী সুরিন্দর চৌধুরীর অপসারণের দাবি তুলেছেন পীর পাঞ্জাল এলাকার একাংশ এনসি বিধায়ক। পাশাপাশি মুবারক গুল বা নাজির গুরেজির মতো কাশ্মীরের বর্ষীয়ান নেতারাও ক্যাবিনেটে জায়গা না পেয়ে ক্ষুব্ধ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিভিন্ন করপোরেশন বা রাজ্য উপদেষ্টা পদে নিয়োগের মাধ্যমে এই ভারসাম্যহীনতা দূর না করা হলে, জম্মুর মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ আরও গহীন হবে, যা আসন্ন পঞ্চায়েত ও পুরভোটে শাসকদলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *