১৯ জনের মৃত্যুতে শেষমেশ রাইটার্সে জরুরি বৈঠক! ‘মণ্ডপ ভাঙছে’ মাইক ঘোষণাই কি কেড়ে নিল প্রাণ?

কলকাতার বিখ্যাত চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জন পুজো পরিক্রমাকারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এবার তদন্তের গতি আরও কয়েক গুণ বাড়াল প্রশাসন। ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য গঠিত ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) এবার কোমর বেঁধে তদন্তের ময়দানে। তদন্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ খতিয়ে দেখতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সিটের প্রধান-সহ অন্যান্য শীর্ষ সদস্যরা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসলেন।

একাদশীর দিন অর্থাৎ গত ২২ অক্টোবর থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, থ্রিডি স্ক্যানিং, ছবি তোলা ও ফরেনসিক পরীক্ষার মতো জটিল ধাপগুলি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করেছেন তদন্তকারীরা। এমনকি, ঘটনার দিন পুজো মণ্ডপে ঠিক কীভাবে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং কীভাবে ১৯ জন নিষ্পাপ মানুষের প্রাণ গেল—তা হাতেনাতে বুঝতে মণ্ডপে ঘটনার হুবহু পুনর্নির্মাণ বা রিকনস্ট্রাকশন করা হয়েছে। ধৃত মাইক ঘোষক সেন্টুকে সরাসরি চোরবাগানের মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ চালান সিটের আধিকারিকেরা।

সেই এক মাইক ঘোষণা ঘিরে উত্তাল তদন্ত!
তদন্তকারীদের আতশিকাঁচের তলায় এখন মূলত একটি প্রশ্ন— ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে!’—এই ভয়াবহ ঘোষণাটি মাইকে কে বা কেন করেছিল? ঠিক কীভাবে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেদিন? কখন ও কার নির্দেশে এই ঘোষণা করা হয়েছিল? আর এর নেপথ্যে কোনো ষড়যন্ত্র বা বড় রকমের কারসাজি ছিল কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কলকাতা হাইকোর্টের সঙ্গে আলোচনা করে রাজ্য সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীকে চেয়ারপার্সন করে এই বিশেষ সিট গঠন করেছে। এই শক্তিশালী তদন্তকারী দলে রয়েছেন রাজ্য স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (STF) ডিজি জাভেদ শামিম, বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি রাজেশ সিন্হা এবং এনডিআরএফের (NDRF) প্রতিনিধিরা। আদালত ও রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে সিট-কে।

রাইটার্সে মেগা বৈঠক ও সিটের নজরে যে সব প্রশ্ন
ঘটনার পুনর্নির্মাণ ও একাধিক ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সিটের প্রধান ও ডিজি জাভেদ শামিম সহ অন্য সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। এখন পর্যন্ত মেলা ফরেনসিক রিপোর্ট, সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং ধৃতদের বয়ান বিশ্লেষণ করাই ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।

সিটের তদন্তে মূলত যে বিষয়গুলি প্রাধান্য পাচ্ছে:

ভিড় ও অবকাঠামো: মণ্ডপে ঢোকা ও বেরোনোর পথ পর্যাপ্ত ছিল কি না, নাকি কাঠামোয় কোনো গাফিলতি ছিল?

আলো ও নিরাপত্তা: আপৎকালীন সময়ে আলোর সুব্যবস্থা ছিল কি না এবং পুলিশের ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল?

পুজো কমিটির দায়: পুজো উদ্যোক্তা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীদের কোনো মারাত্মক গাফিলতি ছিল কি না?

চোরবাগান মণ্ডপে ১৯ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় পুরো রাজ্যজুড়ে পুজো নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্তকারী দলের তরফে জানানো হয়েছে, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জমা পড়বে সেই হাই-প্রোফাইল রিপোর্ট, যার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে চোরবাগান ট্র্যাজেডির আসল অপরাধীদের শাস্তি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *