বাণিজ্য বন্ধ, তবুও পাকিস্তানে উপচে পড়ছে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা! কোন গোপন পথে সীমান্ত পার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মাল?

২০২৫ সালের পাহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্থগিত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এক অদ্ভুত চিত্র তুলে ধরেছে—সব নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে ইসলামাবাদে এখনও ভারতীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা বজায় রয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে পাকিস্তান ভারত থেকে প্রায় ৬১.৭৪ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৪০ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩৬.৫৫ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ। অথচ এই সময়ে পাকিস্তান থেকে ভারতে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি বললেই চলে।

সরাসরি বাণিজ্য বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য কীভাবে পাকিস্তানে পৌঁছাচ্ছে? স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের সংকলিত তথ্যে এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সিঙ্গাপুর কিংবা কলম্বোর মতো তৃতীয় কোনো দেশের ট্রানজিট হাব ব্যবহার করে এই বাণিজ্য চলছে।

বিশিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রবিন্দর সিং রবিন সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি সরাসরি বাণিজ্য স্থগিতই থাকে, তবে এই পণ্যগুলো কোন পথে আসছে এবং এর উৎস কীভাবে নথিবদ্ধ হচ্ছে? চাহিদা যখন এত বেশি, তখন ইসলামাবাদের কি উচিত নয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ করে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা?”

বাণিজ্য তথ্য বলছে, ভারত থেকে পাকিস্তানে আমদানিকৃত পণ্যের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল। এ ছাড়াও প্লাস্টিক, পেট্রোলিয়াম পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, চা, মশলা এবং দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদাও তুঙ্গে।

উল্লেখ্য, পাহেলগাঁওয়ে লস্কর জঙ্গিদের হাতে ২৫ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত কঠোর অবস্থান নেয় এবং সাফ জানিয়ে দেয় যে “সন্ত্রাস ও বাণিজ্য একসঙ্গে চলতে পারে না।” ফলস্বরূপ, স্থলবন্দর ওয়াগাহ-আটারি সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে দু’দেশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

তবে থিংক ট্যাংক ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’ (GTRI)-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব একে ‘গ্রে-জোন স্ট্র্যাটেজি’ বা ধূসর অঞ্চলের কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভারতীয় পণ্যগুলো প্রথমে দুবাই, সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো বন্দরগুলোতে পাঠানো হয়। সেখানকার শুল্কমুক্ত বা ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস’-এ রেখে পণ্যগুলোর লেবেল ও নথিপত্র পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এরপর উৎপত্তির দেশ হিসেবে ভারতের পরিবর্তে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর নাম উল্লেখ করে সেই পণ্যগুলো পাকিস্তানে পুনরায় রপ্তানি করা হয়। এর ফলে নজরদারি এড়ানো সম্ভব হলেও পণ্যের দাম অনেকটাই বেড়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা ও পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ভারত পাকিস্তানের ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ বা সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে বিগত বছরগুলোতে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস পেলেও, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে যে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক বৈরিতা যতই বাড়ুক না কেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর পাকিস্তানের নির্ভরশীলতা কাটানো অত্যন্ত কঠিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *