৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা বাজিমাত! টেক দুনিয়ায় AI-এর মহাযুদ্ধ, কিন্তু বিশাল বিনিয়োগের টাকা উঠবে কীভাবে?

বিশ্বের শীর্ষ সারির টেক সংস্থাগুলির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নিয়ে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা। ইউবিএস গ্লোবাল রিসার্চ (UBS Global Research)-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৬টি শীর্ষস্থানীয় হাইপারস্কেলার (বড় ক্লাউড ও প্রযুক্তি সংস্থা) এআই পরিকাঠামোয় আনুমানিক ৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে সাধারণ বাজেটের বাইরে গিয়ে।

তবে এই বিশাল অংকের অর্থ ঢালার পর বিশ্ব বাজারে এখন একটাই বড় প্রশ্ন— প্রযুক্তি সংস্থাগুলি কি আদৌ এই বিপুল খরচের বিপরীতে পর্যাপ্ত মুনাফা তুলতে পারবে? CoreWeave-এর মতো কিছু নিওক্লাউড সংস্থার বন্ড দুর্বল হওয়ায় বাজারে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও ইউবিএস-এর ইমার্জিং মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট সুনীল তিরুমালাই জানিয়েছেন, নিওক্লাউড সংস্থাগুলি আগামী ৪-৫ বছরের এআই ডেটা সেন্টার খরচের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে পুরো এআই বিনিয়োগের ভৱিষ্যত এদের ওপর নির্ভর করছে না।

১ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়তি লাভের বিশাল চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এতদিন সফটওয়্যার, সোশাল মিডিয়া ও ই-কমার্স থেকে প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি কর-পূর্ব রিটার্ন (Return on Investment) পেয়ে এসেছে, কারণ এতে বিপুল ভৌত সম্পত্তির প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এআই-এর গণিত সম্পূর্ণ আলাদা। বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরির কারণে তাদের অ্যাসেট বেস ব্যাপকভাবে বাড়ছে। ইউবিএস-এর অনুমান, এই পরিবর্তনের ফলে সংস্থাগুলির রিটার্ন অন ইনভেস্টেড ক্যাপিটাল (ROIC) ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

২০৩১ সালের মধ্যে যদি এই সংস্থাগুলি তাদের বিনিয়োগের ওপর ১৫ শতাংশ হারেও রিটার্ন পেতে চায়, তবে তাদের সুদ ও করের আগে অতিরিক্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার (EBIT) উপার্জন করতে হবে। এই পরিমাণ অর্থ সংস্থাগুলির বর্তমান সম্মিলিত উপার্জনের প্রায় দ্বিগুণ! বর্তমান ক্লাউড মার্জিনের ভিত্তিতে এই টার্গেটে পৌঁছাতে সংস্থাগুলিকে অন্তত ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত রাজস্ব (Revenue) তৈরি করতে হবে।

শুধু কর্মদক্ষতা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়লেই চলবে না
ইউবিএস রিপোর্টে বলা হয়েছে, এআই-এর এই বিশাল খরচ তখনই সার্থক হবে যদি দুটি শর্ত পূরণ হয়— প্রথমত, এআই-এর ব্যবহারের ফলে প্রকৃত অর্থে বিশ্ব অর্থনীতিতে কাজ করার ক্ষমতা বা প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি পায়; দ্বিতীয়ত, এআই তৈরি করা সংস্থাগুলি সেই সুবিধা সরাসরি নিজেদের রাজস্বে রূপান্তর করতে পারে।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় ১১০ ট্রিলিয়ন ডলারের। যদি এআই বার্ষিক প্রোডাক্টিভিটি ০.৫%, ১% বা ১.৫% বাড়াতে সক্ষম হয়, তবে ২০৩১ সালের মধ্যে গ্লোবাল জিডিপিতে ৩ থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত যোগ হতে পারে। তবে অর্থনীতি লাভবান হওয়া মানেই যে ডেটা সেন্টার তৈরিকারী সংস্থাগুলোর পকেটে টাকা আসবে, তা নয়। নব্বইয়ের দশকের ডটকম, টেলিকম বা কেবল ইন্ডাস্ট্রির মতো পরিকাঠামো সংস্থাগুলি বিশ্ব অর্থনীতিকে গতি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিজেরা সেই অনুপাতে লাভ করতে পারেনি। তবে আশার কথা হলো, পুরোনো টেলিকম সংস্থাগুলির তুলনায় আজকের বড় টেক হাউসগুলির কাছে অর্থ উপার্জনের একাধিক নমনীয় রাস্তা রয়েছে।

ভারতের জন্য স্বস্তির খবর
বিশ্ব বাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের প্রভাব টেক সংস্থাগুলির বন্ড ইয়েল্ড বাড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ইউবিএস স্পষ্ট করেছে যে, দুর্বল ব্যালেন্স শিট থাকা কিছু সংস্থার ওপরই কেবল ঋণের আসল চাপ রয়েছে। এ ছাড়া ডেটা সেন্টারগুলো চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই।

বিশ্ব জুড়ে এই টানাপোড়েন ও অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের জন্য রয়েছে অত্যন্ত ইতিবাচক খবর। এশীয় ও বিশ্ব প্রযুক্তি শেয়ারে বড় ধরনের ওঠানামা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় শেয়ার বাজার অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশ্বজুড়ে এআই খাতে হওয়া বিপুল খরচের যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে, ভারতীয় বাজার আপাতত তার সরাসরি প্রভাব থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত। এখন গোটা বিশ্ব তাকিয়ে রয়েছে ৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের এই মেগা খেলায় শেষ পর্যন্ত কারা আসল লাভের মুখ দেখে!

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *