ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম আইপিও! মুকেশ অম্বানির এক চালে লাফালাফে গুগল ও মেটার ভাগ্য?

ভারতের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে মুকেশ অম্বানির নেতৃত্বাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ডিজিটাল উইং ‘জিও প্ল্যাটফর্মস’-এর মেগা আইপিও (IPO)। বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির মাঝেই সামনে আসা এই আইপিও-কে ঘিরে বর্তমানে মুম্বই থেকে নিউ ইয়র্ক—সর্বত্র রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। সবথেকে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ২০২০ সালের করোনাকালের ঘোর মন্দার মাঝে জিও প্ল্যাটফর্মসে বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করে রাখা টেক জায়ান্ট ‘মেটা’ (ফেসবুকের অভিভাবক সংস্থা) এবং অনুসন্ধান ইঞ্জিন দানব ‘গুগল’-এর মতো বৈশ্বিক ডিজিটাল জায়ান্টগুলি অম্বানির এই একটি পদক্ষেপেই অভাবনীয় আর্থিক লাভের মুখ দেখতে চলেছে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জিও প্ল্যাটফর্মসের নির্ধারিত আইপিও প্রাইস ব্যান্ডের সর্বোচ্চ মূল্য সূচকে এই দুটি আমেরিকান টেক জায়ান্টের সম্মিলিত শেয়ারের আর্থিক মূল্যায়ন পৌঁছে যেতে চলেছে প্রায় ১.৭৭ লাখ কোটি টাকার অবিশ্বাস্য অঙ্কে! এর ফলে প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে মেটা ও গুগলের ঝুলিতে জমা হতে চলেছে প্রায় ৯৯,৮৪১ কোটি টাকার এক বিশাল ও অভূতপূর্ব ‘কাগজি মুনাফা’ বা পেপার প্রফিট। আর সবথেকে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভারতের সর্বকালের বৃহত্তম এই আইপিও-তে নিজেদের অর্জিত শেয়ারের একটি একক অংশও বাজারে বিক্রি করছে না গুগল কিংবা মেটা!

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির সেই চরম দুঃসময়ে বিশ্ববাজারে বিনিয়োগের টানাপোড়েনের মাঝেও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জিও প্ল্যাটফর্মসের কৌশলগত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বা ২০ হাজার কোটি ডলার সমপরিমাণ) বিপুল মূলধন সংগ্রহ করেছিল। ওই ঐতিহাসিক ফান্ডরেজিং রাউন্ডে মেটা এবং গুগল প্রতি শেয়ারের বিপরীতে মাত্র ৪৮৮.৩৪ টাকা মূল্যে জিও প্ল্যাটফর্মসের বড়সড় ইক্যুইটি শেয়ার বা অংশীদারিত্ব অধিকার করেছিল। এখন ২০২৬ সালের এই মেগা পাবলিক ইস্যু বা আইপিও-র দরজায় দাঁড়িয়ে কোম্পানি প্রতি শেয়ারের অফার প্রাইস ব্যান্ড নির্ধারণ করেছে ১,০৬৫ টাকা থেকে ১,১১৯ টাকা পর্যন্ত। এই সর্বোচ্চ দর অর্থাৎ ১,১১৯ টাকা প্রতি শেয়ারের বর্তমান হিসেব কষলে দেখা যাচ্ছে যে, মার্ক জাকারবার্গের ‘মেটা’-র ঝুলিতে থাকা জিও-র প্রায় ৮৯.২৩ কোটি শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৯,৮৪৬ কোটি টাকায়। যেখানে মেটার প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৪৩,৫৭৩ কোটি টাকা, ফলে স্রেফ এক চালেই কোম্পানিটি প্রায় ৫৬,২৭২ কোটি টাকার নিট পেপার প্রফিট পকেটে পুরে ফেলছে! অন্যদিকে, সুন্দর পিচাইয়ের ‘গুগল’-এর কাছে থাকা জিও-র প্রায় ৬৯.০৯ কোটি শেয়ারের মূলধন মূল্যও ৩৩,৭৩৭ কোটি টাকা থেকে একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭,৩০৭ কোটি টাকায়, যা তাদের এনে দিচ্ছে আনুমানিক ৪৩,৫৬৯ কোটি টাকার এক বিরাট পেপার প্রফিট।

কেবল গুগল বা মেটাই নয়, ২০২০ সালে অম্বানির ডাকে সাড়া দিয়ে জিও-তে বিশাল বিনিয়োগকারী হিসেবে যোগদান করা সিলভার লেক, ভিস্তা ইকুইটি পার্টনার্স, মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, জেনারেল আটলান্টিক, সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF), আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি এবং টিপিজি ক্যাপিটালের মতো আন্তর্জাতিক প্রাইভেট ইকুইটি ও সার্বভৌম তহবিলগুলোও সমানভাবে লাভবান হচ্ছে। সৌদি আরবের পিআইএফ কিংবা কেকেআর-এর মতো যেসব বিশ্বস্ত বিনিয়োগকারী প্রতি শেয়ারে ৫৪৯.৩১ টাকা মূল্যে এন্ট্রি নিয়েছিল, তারাও বর্তমান প্রাইভেট ভ্যালুয়েশনের ১,১১৯ টাকা দর অনুযায়ী অন্তত ১০৪ শতাংশ পর্যন্ত নিট রিটার্ন অর্জন করছে। আগামী ২১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হতে চলেছে জিও প্ল্যাটফর্মসের বহুল চর্চিত এই আইপিও এবং আবেদনের শেষ দিন নির্ধারিত হয়েছে ২৩ অক্টোবর। পরবর্তীতে আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে সফল শেয়ার বরাদ্দের কাজ চুকিয়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) ও বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE)-এর মূল পাতায় ২৮ অক্টোবর এই মেগা শেয়ারের তালিকাভুক্তি ঘটার কথা রয়েছে।

সর্বোচ্চ প্রাইস ব্যান্ড ১,১১৯ টাকার ভিত্তিমূল্যের ওপর দাঁড় করিয়ে গোটা জিও প্ল্যাটফর্মসের সামগ্রিক আর্থিক মূল্যায়ন বা এন্টারপ্রাইজ ভ্যালুয়েশন বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০.৩ লাখ কোটি টাকার সুউচ্চ চূড়ায়। এই অভূতপূর্ব মেগা পাবলিক অফারিংয়ের মাধ্যমে বাজার থেকে সর্বমোট প্রায় ৩০,২১৩ কোটি টাকা অর্থ সংগ্রহের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রিলায়েন্স জিও, যা ভারতের কর্পোরেট পুঁজিবাজারের গত বছরের সমস্ত রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। এই রেকর্ড পরিমাণ মূলধন হাতে এলে হুন্ডাই মোটর ইন্ডিয়ার ২৭,৯০০ কোটি টাকার আইপিও-র পূর্ববর্তী জাতীয় রেকর্ড ভেঙে দেশীয় পুঁজিবাজারের ইতিহাসে চিরকালের জন্য ১ নম্বর স্থানটি দখল করে নেবে অম্বানির জিও। সংগৃহীত এই বিশাল অর্থ থেকে প্রায় ২৭,৫০ জন কোটি টাকা কোম্পানির বকেয়া ঋণ বা পূর্ববর্তী দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক দেনা মেটাতে পুরোপুরি ব্যবহার করা হবে এবং অবশিষ্ট অংশ রিলায়েন্সের স্বাভাবিক কর্পোরেট সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা হবে। ফলে ভারতীয় পুঁজিবাজারে এই ঐতিহাসিক আইপিও বিশ্বব্যাপী নতুন বিনিয়োগের তোড়জোড় তৈরি করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *