মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করেন গণপরিবহণ! দিল্লির দূষণ ও যানজটের আসল কারণ জানলে চমকে যাবেন

দীপাবলি আসন্ন আর উৎসবের আমেজ ইতিমধ্যেই মানুষের মধ্যে দেখা যেতে শুরু করেছে। সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও লুকিয়ে প্রচুর বাজি ফাটানো হয়, যার জেরে দিল্লিতে দেখা দেয় ভয়াবহ দূষণ। হঠাৎই বাতাস বিষাক্ত হয়ে ওঠে, আকাশে নেমে আসে ধোঁয়াশার চাদর এবং শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু দিল্লি-এনসিআর নয়, আশপাশের কয়েক ডজন শহরও এই দূষণের কবলে পড়ে। এরপর শুরু হয় সমাধানের চেষ্টা এবং সরকার সাধারণ মানুষকে ‘কার পুলিং’ করতে কিংবা যতটা সম্ভব গণপরিবহণ ব্যবহারের আবেদন জানায়। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, সরকারের সমস্ত প্রচেষ্টার পরও দেশে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ গণপরিবহণ ব্যবহার করেন।
সমস্যার বিষয় হল, এখন শুধু দিল্লিতেই যানজট হয় না, বরং গোটা দেশের রাস্তাতেই প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের ঘটনা সাধারণ হয়ে উঠেছে। ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর একটি বড় কারণ হতে পারে যে বেশিরভাগ মানুষ কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার করেন। ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স অফিস (এনএসও)-এর প্রথম ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ট্রাভেল সার্ভে (এনএইচটিএস) অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১৫ শতাংশ কর্মী বাস, ট্রেন, ট্রাম বা অটো-রিকশার মতো গণপরিবহণে কর্মস্থলে যান। অন্যদিকে, ৪৬ শতাংশ কর্মী দুই চাকার গাড়ি বা চার চাকার সাহায্য নেন।
এই সমীক্ষায় বেশ কয়েকটি চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি হল, দেশজুড়ে দুই চাকার গাড়িতে কর্মস্থলে যাওয়া কর্মীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গোটা দেশে ৪৩ শতাংশ কর্মী দুই চাকার গাড়িতে এবং মাত্র ৩ শতাংশ কর্মী গাড়িতে করে অফিসে পৌঁছন। শহরাঞ্চলে এই নির্ভরতা আরও বেড়ে যায়; সেখানে ৫৩ শতাংশ কর্মী দুই চাকার গাড়ি এবং ৫.৭ শতাংশ কর্মী গাড়ি ব্যবহার করেন। যদিও গাড়ি বা বাইক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে গোয়া ও পঞ্জাব দিল্লির তুলনায় কয়েক গুণ এগিয়ে রয়েছে।
হেঁটেও অফিসে পৌঁছন বহু মানুষ
এই সমীক্ষায় আরও একটি তথ্য সামনে এসেছে—ভারতে হেঁটে কর্মস্থলে যাওয়া দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত মাধ্যম। মোট ২৮.৩ শতাংশ কর্মী হেঁটেই অফিসে পৌঁছন। গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলে ১৪ শতাংশ মানুষ হেঁটে কর্মস্থলে যান। অন্যদিকে, সাইকেলে করে কর্মস্থলে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ১০.৭ শতাংশ।
সমীক্ষায় উঠে আসা কিছু আকর্ষণীয় তথ্য:
সময়ের পরিধি: এই সমীক্ষাটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ জুনের মধ্যে করা হয়েছে। এতে এক কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের যাত্রাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি, যাতায়াতের আসা এবং যাওয়াকে দুটি পৃথক যাত্রা হিসেবে ধরা হয়েছে।
যাত্রার সময়: সমীক্ষা অনুযায়ী, একজন কর্মীর অফিসে পৌঁছতে গড়ে ২৫ মিনিট সময় লাগে। শহরাঞ্চলে এই সময় ২৭ মিনিট এবং গ্রামাঞ্চলে ২৩ মিনিট। সকাল ১০টার আগে প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মী বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।
ভাড়ার খরচ: যাতায়াতের জন্য কর্মীরা প্রতি মাসে গড়ে ৭৮৫ টাকা খরচ করেন। পুরুষদের খরচ মহিলাদের তুলনায় অনেক বেশি—পুরুষরা গড়ে ৮৩৫ টাকা খরচ করেন, যেখানে মহিলারা মাত্র ৫৩৩ টাকা খরচ করেন। গ্রামীণ এলাকায় এই পার্থক্য আরও বেড়ে যায়, যেখানে পুরুষরা ৬৭৪ টাকা এবং মহিলারা মাত্র ৩০৭ টাকা খরচ করেন।
পড়ুয়াদের যাতায়াতের ধরন আলাদা
তবে পড়ুয়াদের যাতায়াতের মাধ্যম কর্মীদের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হেঁটে যাওয়াকেই বেছে নেন। স্কুল-কলেজে যাওয়া পড়ুয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩৭ শতাংশ হেঁটে যাতায়াত করেন। এরপর ২৯.৫ শতাংশ বাস এবং ১৫.৮ শতাংশ সাইকেল ব্যবহার করেন। প্রায় ৮৮ শতাংশ পড়ুয়া আধ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যান (গড় যাত্রার সময় ২৩ মিনিট)। প্রায় চারজন পড়ুয়ার মধ্যে তিনজন সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।
এনএসও জানিয়েছে, রেল মন্ত্রকের বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এই সমীক্ষা যাতায়াতের মাধ্যম, সময় এবং কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে। এর ফলে বর্তমান পরিবহণ ব্যবস্থার খামতিগুলি বুঝতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে, রুটের উন্নয়ন ঘটাতে এবং পরিষেবার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে সাহায্য হবে।
এই পরিসংখ্যানগুলি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশে গণপরিবহণের ব্যবহার এখনও খুবই কম এবং বেশিরভাগ মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহন অথবা হেঁটে চলাফেরার উপর নির্ভরশীল। শহরগুলিতে যানজটের সমস্যার অন্যতম বড় কারণ এটিই। বাস ও ট্রেনের মতো পরিষেবাগুলিকে আরও উন্নত করা হলে শুধু যানজটই কমবে না, সাধারণ মানুষের খরচও কমবে। সমীক্ষার এই ফলাফল নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।