স্টেশনের নাম সবসময় হলুদ বোর্ডে কুচকুচে কালো হরফেই কেন লেখা থাকে? এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিরাট বৈজ্ঞানিক রহস্য!

ভারতীয় রেল (Indian Railways)-এ প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ যাতায়াত করেন। ট্রেনের জানলার ধারে বসে থাকার সময় কিংবা দূরপাল্লার যাত্রায় প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখে একটা জিনিস নিশ্চয়ই আমাদের সকলের চোখে পড়ে। তা হলো— দেশের যেকোনো ছোট-বড় স্টেশনের নামফলক বা নেমবোর্ড সব সময়ই উজ্জ্বল হলুদ রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর কুচকুচে কালো কালিতে লেখা থাকে। হাওড়া হোক বা শিয়ালদহ, সর্বত্রই এই একই ছবি দেখা যায়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, নীল, লাল বা সবুজ রঙের বাহার বাদ দিয়ে ঠিক কেন এই হলুদ আর কালো রঙের যুগলবন্দিকে বেছে নেওয়া হলো? এর নেপথ্যে জড়িয়ে রয়েছে এক চমৎকার বিজ্ঞান ও সুরক্ষার বড় ইতিহাস।
হলুদ রঙকে বেছে নেওয়ার আসল কারণ কী?
এই বিশেষ রং নির্বাচনের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারণটি হলো ‘দৃশ্যমানতা’ বা সহজে চোখে পড়া। বিজ্ঞান বলছে, মানুষের চোখ খুব দূর থেকে হলুদ রংকে সবচেয়ে দ্রুত চিনতে ও ধরতে পারে। যদিও লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, তবুও হলুদ রঙের প্রতি আমাদের চোখ অনেক বেশি সংবেদনশীল। ট্রেন যখন প্রবল বেগে ছুটতে থাকে, তখন লোকো পাইলট বা চালকের হাতে স্টেশনের নাম পড়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় থাকে। হলুদ রঙের বোর্ড অনেক দূর থেকেই চালকের চোখে পড়ে যায়, ফলে তিনি আগে থেকেই সতর্ক হতে পারেন এবং ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুবিধা হয়।
কালো কালিতে লেখার কারণ ও ‘হাই কন্ট্রাস্ট’
হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর কালো রঙের লেখাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘হাই কন্ট্রাস্ট’ বলা হয়। এই রঙের মিশ্রণ সবচেয়ে বেশি ফোটে। ফলে যাত্রীদের রানিং ট্রেন থেকে নাম পড়তে চোখের ওপর কোনো বাড়তি চাপ পড়ে না। ট্রেনটি হয়তো তীব্র গতিতে স্টেশন পেরিয়ে চলে যাচ্ছে, তবুও চোখের পলকে স্টেশনের নাম স্পষ্টভাবে পড়া সম্ভব হয়।
পাশাপাশি, কালো কালির আরও একটি বড় সুবিধা হলো এটি আলো প্রতিফলিত করে না। রাতের বেলা ট্রেনের জোরালো হেডলাইট বা স্টেশনের লাইট হলুদ বোর্ডের ওপর পড়লেও কালো লেখার ওপর তা প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না। অন্ধকার রাত হোক কিংবা শীতের ঘন কুয়াশা— হলুদ রং সব সময়ই দূর থেকে নজর কাড়ে। এছাড়া মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও হলুদ রং মানুষের মস্তিষ্ককে দ্রুত সতর্ক করে তোলে।
রেলের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ম্যানুয়াল
‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর নিয়ম অনুযায়ী, দেশের সমস্ত স্টেশনের নেম বোর্ডে ‘ট্রাফিক ইয়েলো’ রঙের ওপর কালো হরফ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। এই নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মূল সাইনবোর্ডের অক্ষরের উচ্চতা ৩০০ মিলিমিটার এবং ছোট বোর্ডের ক্ষেত্রে তা অন্তত ৭৫ মিলিমিটার হতে হবে। অর্থাৎ, রেলের এই রং বাছানির বিষয়টি নেহাত কোনো সাধারণ বা শৌখিন সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ যাত্রী ও চালকদের নিরাপত্তা। যুগ যুগ ধরে এই বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনেই দেশজুড়ে পরিষেবা দিয়ে চলেছে ভারতীয় রেল।