সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ শ্রদ্ধা! প্রধানমন্ত্রীর কোন বার্তা ছুঁয়ে গেল কোটি কোটি দেশবাসীর মন?

শারীরিক নশ্বরতা ইহলোক ত্যাগ করেছে চার বছর আগে। কিন্তু তাঁর জাদুকরী কণ্ঠ ও অনুপম গান আজও বেঁচে রয়েছে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ও স্মৃতিতে। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, ভারতীয় সঙ্গীতের অন্যতম উজ্জ্বল ও অবিকল্প অধ্যায়, কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের জন্মবার্ষিকী। সুরের এই মহীয়সী নারীর জন্মদিনে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ বার্তা শেয়ার করে লতা মঙ্গেশকরের অনন্য সঙ্গীত প্রতিভা এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী অবদানের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর এক্স (যাঁকে আগে টুইটার বলা হতো) হ্যান্ডলে লিখেছেন, লতা দিদির জন্মবার্ষিকীতে তিনি অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। তাঁর অসাধারণ গায়কী ও সুরের মহিমা বিশ্বমঞ্চে ভারতের নাম আরও উজ্জ্বল করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মোদির কথায়, লতা মঙ্গেশকর কেবল তাঁর সুমধুর কণ্ঠ দিয়ে ভারতকে সমৃদ্ধই করেননি, বরং দেশের সামগ্রিক কল্যাণ ও প্রগতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন জনহিতকর উদ্যোগেও সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। ভারতীয় সঙ্গীত জগতে তাঁর এই অনন্য অবদান আগামী দিনেও প্রতিটি প্রজন্মের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংগীতের স্বর্ণালী দুনিয়ায় এক অনন্য পথচলা
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে জন্মগ্রহণ করেন লতা মঙ্গেশকর। তাঁর বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী এবং নামী নাট্য অভিনেতা। পরিবারের সঙ্গীতের আবহেই বেড়ে ওঠা লতা মাত্র ১৩ বছর বয়সে, ১৯৪২ সালে একটি মারাঠি ছবির জন্য প্রথম গান রেকর্ড করেন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেরও অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী হয়ে ওঠেন।

লতার কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, ভক্তি কিংবা দেশপ্রেম—প্রায় সব ধরনের আবেগই যেন এক আলাদা মাত্রা পেত। বিশেষ করে ১৯৬৩ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের ঠিক পরের পরাধীন ও বিষণ্ণ আবহে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উপস্থিতিতে যখন তিনি ‘এ মেরে ওয়তন কে লোগোঁ’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন, তখন উপস্থিত সকলের চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে সেই গানটিই ভারতের দেশাত্মবোধক গানের অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

অমর সৃষ্টি ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান
দীর্ঘ ও বর্ণময় সঙ্গীতজীবনে লতা মঙ্গেশকর একের পর এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ এবং তিনটি মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পাশাপাশি, চারটি ফিল্মফেয়ার সেরা মহিলা প্লেব্যাক পুরস্কারের সঙ্গে তিনি ভূষিত হয়েছেন ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডেও। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ফরাসি সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মান ‘অফিসার অব দ্য লিজিয়ন অব অনার’-এও ভূষিত করা হয়েছিল তাঁকে।

ভারতীয় সংগীতে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজ্য সরকার তাঁর নামে বিশেষ পুরস্কার প্রবর্তন করে। ১৯৮৪ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার ‘লতা মঙ্গেশকর অ্যাওয়ার্ড’ চালু করে এবং ১৯৯২ সালে মহারাষ্ট্র সরকারও তাঁর নামে নতুন পুরস্কার প্রবর্তন করে। ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে সুরের এই চিরদিনের পাখি চিরবিদায় নেয়। শারীরিকভাবে তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও, তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা লক্ষ লক্ষ গান আজও ভারতীয় সঙ্গীতের অমূল্য ও অক্ষয় সম্পদ হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *