কোডিং ছেড়ে মশার মস্তিষ্ক আর মানুষের ডিপ্রেশন নিয়ে গবেষণা! আইআইটি প্রাক্তনী নীতিন গুপ্তর অবিশ্বাস্য জার্নি শুনলে মাথা ঘুরে যাবে

ভারতে আইআইটি (IIT)-র তকমা মানেই যেন সাফল্যের এক অবিসংবাদিত চাবিকাঠি। ইসরোর বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে মাইক্রোসফট কিংবা ওরাকেলের মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থায় দাপিয়ে বেড়ানো—আইআইটি প্রাক্তনী মানেই কেরিয়ারের সোনার চাবিকাঠি হাতে পাওয়া। কিন্তু সেই প্রচলিত ইঁদুরদৌড় বা নিরাপদ কর্পোরেট জীবনকে সপারিবারে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ অন্য এক অচেনা পথে হেঁটে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আইআইটি কানপুরের প্রাক্তনী নীতিন গুপ্ত।

আইআইটি জয়েন্টে সর্বভারতীয় প্রথম স্থান
সালটা ২০০০। জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন নীতিন গুপ্ত। এরপর আইআইটি কানপুর থেকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে বি-টেক সম্পূর্ণ করে ২০০৪ সালে স্নাতক হন। যে কোনো ছাত্রের কাছেই এই সাফল্যের পর সিলিকন ভ্যালিতে মোটা বেতনের কোডিং বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি ছিল জলভাত। কিন্তু নীতিনের মাথাতে তখন অন্য এক স্বপ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

কম্পিউটার সায়েন্সের গণ্ডি পেরিয়ে আইআইটিতে পড়ার সময়ই জীববিজ্ঞানের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেন তিনি। সেই প্রবল কৌতূহলই তাঁকে সুদূর আমেরিকায় টেনে নিয়ে যায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োইনফরম্যাটিক্স এবং সিস্টেম বায়োলজি নিয়ে পিএইচডি শেষ করেন নীতিন। আমেরিকার একটি গবেষণাগারে খাবার বা অর্থের লোভ কীভাবে মানুষের মস্তিষ্কে তাড়না তৈরি করে, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথ’-এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বা ইলেক্ট্রোফিজিওলজি নিয়ে কাজ করে ধীরে ধীরে পাকাপাকিভাবে নিউরোসায়েন্টিস্ট হয়ে ওঠেন তিনি।

আমেরিকা ছেড়ে কেন ফিরলেন ভারতে?
বিদেশে আকাশছোঁয়া কেরিয়ার ও স্থায়ী বন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও নীতিনের মন পড়ে ছিল নিজের দেশেই। তাঁর ভাষায়, মুখে মুখে ফেরা ‘স্বদেশ’ সিনেমাটি তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আবেগপ্রাহত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। ফলস্বরূপ, ২০১৪ সালে সমস্ত সুখস্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে সপরিবারে ভারতে ফিরে আসেন নীতিন। যোগ দেন তাঁর পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি কানপুরের বায়োলজিক্যাল সায়েন্স এবং বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে।

মশার মস্তিষ্ক থেকে ডিপ্রেশনের চিকিৎসা!
নীতিন গুপ্তর গবেষণার ক্ষেত্রটি অত্যন্ত অভিনব। তিনি প্রচলিত কোনো গতানুগতিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোজেক্টে হাত না দিয়ে বেছে নেন মস্তিষ্কের জটিল সার্কিট নিয়ে কাজ করতে। কীভাবে গন্ধ শনাক্ত হয়ে তা মানুষের বা কীটপতঙ্গের আচরণে পরিণত হয়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। আর এই কাজে তাঁর প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে ঘাসফড়িং, মাছি এবং মশা।

বিশেষ করে মশার মস্তিষ্কের ‘অ্যান্টেনাল লোব’ (Antennal Lobe) কীভাবে গন্ধ চেনে এবং রক্ত খাওয়ার পর স্ত্রী মশার মানুষের গন্ধের প্রতি আকর্ষণ কেন বদলে যায়, তা নিয়ে গভীর গবেষণা চালাচ্ছেন তাঁর গবেষক দল। তবে তাঁর কাজ কেবল কীটপতঙ্গের মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ নেই। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁর দল তৈরি করেছে ‘ট্রেডউইল’ (TradeWell) নামে একটি অত্যাধুনিক থেরাপি প্রোগ্রাম। যে সমস্ত মানুষ খরচের কারণে বা অন্য কোনো সমস্যায় প্রথাগত থেরাপিস্টের কাছে যেতে পারেন না, তাঁদের জন্য এটি আশীর্বাদস্বরূপ। ইতিমধ্যে প্রায় ৫৯৮ জন মানুষের ওপর এই প্রোগ্রামের সফল ট্রায়াল করা হয়েছে এবং দেখা গেছে এর মাধ্যমে মারাত্মকভাবে কমেছে ডিপ্রেশন। মশার মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে মানুষের মনস্তত্ত্ব—এই দুই আপাতবিরোধী ক্ষেত্রকে এক সুতোয় বেঁধে নীতিন গুপ্ত প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, আইআইটি মানে কেবল কোডিং আর প্রফিট নয়, এর বাইরেও মানবকল্যাণের এক বিশাল দুনিয়া অপেক্ষা করে রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *