মহাকাশে অস্ত্রশস্ত্র মজুত রেখেছে আমেরিকা! দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সব স্বীকার করল সুপার পাওয়ার

এতদিনের সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিল আমেরিকা। এই প্রথম মার্কিন প্রশাসনের তরফ থেকে মহাকাশে তাদের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হলো। আমেরিকার স্পেস ফোর্স বা মহাকাশ বাহিনীর এক মুখপাত্রের দাবি, মূলত মহাশূন্যে শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করতেই কক্ষপথে অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখার এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মহাকাশে ঠিক কী ধরনের বা কতটা শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র তারা মোতায়েন করে রেখেছে, সে বিষয়ে মার্কিন পক্ষ থেকে এখনও সুনির্দিষ্টভাবে কিছু খোলসা করা হয়নি।
মহাকাশে সামরিক পরিকাঠামো ও আমেরিকার ব্যাখ্যা
আমেরিকা, রাশিয়া এবং চিনের মতো মহাশক্তিধর দেশগুলি যে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশেও তাদের যুদ্ধ পরিকাঠামো গড়ে তুলছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা ছিল দীর্ঘদিনের। এমনকি অতীতে মহাকাশে পরমাণু বোমা পাঠানোর মতো গুরুতর দাবিও সামনে এসেছিল। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে সেই খবরে সিলমোহর দেয়নি।
অবশেষে সেই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ইউএস স্পেস ফোর্সের (US Space Force) এক মুখপাত্র সোমবার স্পষ্ট ভাষায় জানান, “মহাকাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শত্রুপক্ষকে উপযুক্ত জবাব দিয়ে ঠেকানোর মতো অস্ত্রশস্ত্র কক্ষপথে মোতায়েন রয়েছে।” মহাকাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে আমেরিকার দাবি—এর নেপথ্যে আক্রমণাত্মক এবং আত্মরক্ষা—এই দুই উদ্দেশ্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের আবহ
আমেরিকার এই অভাবনীয় ঘোষণাতেই রীতিমতো অশনি সঙ্কেত দেখতে শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের জোরালো ধারণা, মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারের এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকার সঙ্গে প্রধানত চিন ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। পৃথিবীর বাইরেও চিন এবং রাশিয়াকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকান মহাকাশ বাহিনীর দাবি, কেবল পৃথিবীতেই নয়, চিন তাদের সামরিক শক্তির আধুনিকীকরণের পাশাপাশি মহাকাশ প্রতিরক্ষাকেও তাদের মূল রণকৌশলের অংশ করে তুলেছে। অন্যদিকে, রাশিয়াও মহাকাশকে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। মস্কো ও বেজিং উভয়েরই দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে এই মহাকাশই। তাই সেখানে আধিপত্য বিস্তার করতে দীর্ঘদিন ধরেই তৎপর রয়েছে এই দুই দেশ। যদিও চিন বা রাশিয়া মহাশূন্যে অস্ত্রশস্ত্র মজুত করেছে কি না, তার পক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনো শক্তপোক্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি এবং আমেরিকার এই ঘোষণার পর প্রতিপক্ষ দেশগুলির তরফ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
মহাকাশের সামরিকীকরণের দীর্ঘ ইতিহাস ও চুক্তি
তবে মহাকাশের এই সামরিকীকরণ কিন্তু রাতারাতি শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মহাশূন্যে প্রথম ‘স্পুটনিক’ (Sputnik) উৎক্ষেপণ করে, ঠিক তারপর থেকেই কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং পৃথিবীর বাইরে থেকে শত্রুপক্ষের ওপর আঘাত হানার কৌশল নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায়। এর জেরে মহাকাশে পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অবশেষে ১৯৬৭ সালে ঐতিহাসিক ‘মহাকাশ অস্ত্র চুক্তি’ (Outer Space Treaty) স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতে মহাকাশে বিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। একইসঙ্গে মহাকাশে সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী পরিকাঠামো স্থাপন এবং সামরিক মহড়া চালানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমনকি চাঁদ বা অন্য কোনো উপগ্রহে এমন কিছু করা যাবে না বলেও পরিষ্কার বলা হয়েছিল।
তবে আইনি ফাঁকফোকর অনুযায়ী, পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে অস্ত্রশস্ত্র মজুত করার বিষয়টি ওই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ ছিল না। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই এবার মহাশূন্যে নিজেদের সামরিক আধিপত্যের কথা abiert স্বীকার করে নিল আমেরিকা।