যেখানে স্টপেজ নেই, সেখানে হঠাৎ থামল দার্জিলিং মেল! ট্রেনের মধ্যে একরত্তির কান্না দেখেই রেল যা করল, চোখে জল আসবে

কথায় আছে, সবার ওপরে মানবতা। সেই মানবিকতারই এক অপূর্ব নজির গড়ল ভারতীয় রেলওয়ে। ফরাক্কার লাইনে ধসের জেরে যখন উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন এবং একাধিক ট্রেন ঘুরপথে চলছে, ঠিক সেই সময়েই একরত্তির মুখে একটু দুধ পৌঁছে দিতে যেখানে নির্ধারিত স্টপেজ নেই, সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হলো প্রিমিয়াম ট্রেন দার্জিলিং মেল।
ফরাক্কা বিপর্যয়ের জেরে উত্তরবঙ্গগামী ও উত্তরবঙ্গ থেকে শিয়ালদহগামী একাধিক ট্রেন বিকল্প রুটে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার জেরে ট্রেনগুলি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে চলছে। এমনই পরিস্থিতিতে প্রায় আট ঘণ্টা দেরিতে চলা শিয়ালদহমুখী দার্জিলিং মেলের একটি এসি কামরায় (A2) কিশানগঞ্জ থেকে সন্তানকে নিয়ে ওঠেন এক মহিলা যাত্রী। ট্রেনটি মালদহ পর্যন্ত নির্দিষ্ট রুটে আসার পর যখন বিকল্প রুটে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তখন থেকেই সেটি আর কোনো নির্ধারিত স্টেশনে দাঁড়ানোর কথা ছিল না। ওই মহিলা আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিলেন যে মালদহের পরের কোনো স্টেশন থেকে নিজের আত্মীয়ের মাধ্যমে বাচ্চার জন্য দুধ সংগ্রহ করবেন। কিন্তু রুট পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় তিনি মারাত্মক বিপাকে পড়েন।
ক্ষিদেয় ছটফট করতে থাকা একরত্তি সন্তানের কান্না দেখে ঘাবড়ে যান ওই মা। উপায় না পেয়ে তিনি ট্রেন থেকেই উত্তরপ্রদেশে থাকা তাঁর স্বামীকে ফোন করে সমস্ত পরিস্থিতি জানান। এরপর ওই মহিলার স্বামী আজগার আলি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ভারতীয় রেলের অফিসিয়াল “রেল মদত” অ্যাপে সম্পূর্ণ বিষয়টি জানান এবং তাঁর সন্তানের জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।
অভিযোগ বা তথ্যটি শিয়ালদহের কমার্শিয়াল কন্ট্রোল বিভাগের কাছে পৌঁছানো মাত্রই তা দ্রুত ডিআরএম-এর নজরে আনা হয়। এরপর তৎপর হয়ে ওঠে রেল প্রশাসন। ট্রেনটি ব্যান্ডেল স্টেশনে পৌঁছলে রেল কর্মীরা ওই মহিলা যাত্রীকে খোঁজার চেষ্টা চালালেও ভিড়ের মাঝে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে হাল ছাড়েননি রেলকর্মীরা। এরপর ট্রেনটি নৈহাটি স্টেশনে পৌঁছলে সেখানে জরুরি সিগন্যাল দিয়ে ট্রেনটিকে থামানো হয়। নৈহাটি স্টেশনে নির্ধারিত স্টপেজ না থাকা সত্ত্বেও ট্রেন থামিয়ে রেল কর্মীরা হদিস নেন ওই মায়ের এবং তাঁর হাতে তুলে দেন শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধের বোতল।
রেলের এই দ্রুত পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই আপ্লুত ওই পরিবার। উত্তরপ্রদেশ থেকে টেলিফোনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আজগার আলি জানান, ট্রেন ঘুরিয়ে দেওয়ায় তাঁর স্ত্রী ও শিশু চরম সংকটে পড়েছিল। কিন্তু রেল দপ্তরে যোগাযোগ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেভাবে তারা উদ্যোগ নিয়ে সন্তানের মুখে দুধ পৌঁছে দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিপর্যয় এবং দীর্ঘ আট ঘণ্টার যাত্রাপথের ক্লান্তি ছাপিয়ে রেলের এই মানবিক মুখই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সব মহলের চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৮ ঘণ্টা পরে দুপুর ১টা বেজে ৪৩ মিনিটে নিরাপদে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পৌঁছায় দার্জিলিং মেল।