অন্ধকার জঙ্গলে হারিয়ে গেল লঞ্চ, ভেসে এল বাঘের গর্জন! মহানায়কের কোন উপস্থিত বুদ্ধিতে সেদিন বেঁচেছিল পুরো ইউনিট?

মৃত্যুর এত বছর পরেও উত্তমকুমারের স্টারডম এবং রূপকথার আবেশ একটুও ম্লান হয়নি। তাঁর মোহময়ী আকর্ষণ ও উপস্থিত বুদ্ধির এমনই এক রোমহর্ষক ঘটনার কথা পরিচালক প্রভাত রায় তাঁর ‘ক্ল্যাপস্টিক’ আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন, যা আজও পাঠকদের শিহরিত করে।

পরিচালক শক্তি সামন্তের কালজয়ী ছবি ‘অমানুষ’-এর শুটিং তখন তুঙ্গে। বোম্বাইয়ের আন্ধেরি থেকে সুন্দরবনের সন্দেশখালিতে চলছিল আউটডোর। বিখ্যাত গান ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’-এর শুটিংয়ের ফাঁকেই ঘটেছিল সেই ভয়ানক বিপত্তি। লঞ্চটি সুন্দরবনের একটি ছোট খাল দিয়ে অতিরিক্ত গভীরে ঢুকে পড়ে। যতই সময় এগোচ্ছিল, খাল ততই সরু হচ্ছিল আর দুই পাশের ঘন জঙ্গল যেন আরও কাছে এগিয়ে আসছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ আলো কমে যাওয়ায় শক্তি সামন্ত শুটিং প্যাক আপ করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

কিন্তু আসল বিপদ বাধে অন্য জায়গায়। কলকাতার লঞ্চ চালক সুন্দরবনের গোলকধাঁধাঁ ভরা খাঁড়িপথ চেনেন না। চারপাশ নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার পর লঞ্চ ঘুরিয়ে ভুল করে এক গভীর খালে গিয়ে পড়েন তিনি। আর তখনই চারপাশ থেকে ভেসে আসে গা ছমছমে বাঘের ডাক! অন্ধকারের মধ্যে সেই ভয়ানক পরিস্থিতিতেও উৎপল দত্ত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে শর্মিলা ঠাকুরকে মজা করে বলেন, “রিঙ্কু, তোমার সোমার শ্বশুরবাড়ির দেশে এসেছি তো! টাইগার ডাকছে তোমাকে।” জবাবে শর্মিলাও হেসে বলেন, “শুধু আমাকে নয়, আপনাদের সবাইকে ডাকছে, ডিনার খাওয়াবে বলে!”

এদিকে পরিচালক শক্তি সামন্ত চিন্তায় থাকলেও উত্তমকুমার একেবারে শান্তভাবে একমনে গান গেঁথে চলেছেন। কিছুদূর যাওয়ার পর অন্ধকারে একটি হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলো দেখতে পাওয়া যায়। সেই আলোর দিকে লঞ্চ ভেড়ানোর পর এক চা দোকানদার বড় কেটলিতে গরম চা আর মুড়ি নিয়ে লঞ্চে ওঠেন। কিন্তু মহানায়ককে দেখেই তিনি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। চা-মুড়ি খাওয়ার পর ওই দোকানদার লঞ্চ থেকে নেমে গ্রামে গিয়ে খবর দেন।

এর কিছুক্ষণ পরই নদীর পাড়ে শতকণ্ঠে “গুরু-গুরু” চিৎকার শুরু হয়। দেখা যায়, পাড়ে অন্তত শ’খানেক হ্যারিকেন হাতে শত শত মানুষ ছুটে এসেছে। ভক্তদের অনুরোধে উত্তমকুমার ডেকে এসে দাঁড়াতেই সার্চলাইটের আলো পড়ে তাঁর মুখে, আর তাতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। প্রভাত রায় লিখেছেন, সেদিন সেই মানুষের ভিড় আর হাততালিতেই বোধহয় বাঘ পালিয়েছিল। এরপর স্থানীয় তিনজন মানুষ এসে গভীর রাতেই নিরাপদে পথ দেখিয়ে পুরো ইউনিটকে রিসোর্টে পৌঁছে দেন। পরিচালকের মতে, সেদিন উত্তমদা পাশে না থাকলে আদৌ ফিরে আসা যেত কিনা সন্দেহ।

Samrat Das
  • Samrat Das

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *